কার্টেসী- : সামরিক নিউজ আপডেট
আমেরিকার সামরিক উৎপাদন যেভাবে কমিয়ে দিচ্ছে চীন!
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে আমেরিকার অস্ত্রের মজুদ প্রায় শেষ হয়ে যাওয়ার পর, আমেরিকাকে নতুন অস্ত্র তৈরিতে এক মারাত্মক অদৃশ্য বাধা সৃষ্টি করেছে চীন। আর বেইজিংয়ের এই কৌশলী ও দূরদর্শী চাপের মুখেই শেষ পর্যন্ত ইরান যুদ্ধ থেকে পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছে আমেরিকা!
দৃশ্যত মনে হতে পারে, চীন এই যুদ্ধে নিরপেক্ষ। কিন্তু পর্দার আড়ালে চীন তার পরম মিত্র ইরানের জন্য এমন এক ‘মাস্টারস্ট্রোক’ খেলেছে, যা সরাসরি ওয়াশিংটনের সামরিক ফুসফুস চেপে ধরেছে। নিচে এর একটি বিস্তারিত সামরিক ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণ দেওয়া হলো।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স (Reuters) একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল খবর প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূরাজনৈতিক উদ্বেগের কারণে চীনের রেয়ার আর্থ কোম্পানিগুলো আমেরিকায় কিছু চালান পাঠানো স্থগিত করেছে।
গত কয়েক মাসে ইরান যুদ্ধে নামার পর আমেরিকার অস্ত্র সংকট একেবারে প্রকাশ্য রূপ নেয়। অস্ত্রের মজুদ ফুরিয়ে যাওয়ার পর আমেরিকা যখন দ্রুত নতুন প্রজন্মের হাই-টেক ফাইটার জেট (F-35), গাইডেড মিসাইল, ড্রোন ও রাডার সিস্টেম তৈরি করতে যায়, তখনই চীন তাদের আসল চালটি চাল দেয়।
আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র তৈরির জন্য অপরিহার্য উপাদান হলো বিরল খনিজ বা Rare Earth Elements (REE)। আর এই খনিজ পরিশোধন ও স্থায়ী চুম্বক বাজারের ৯১% থেকে ৯৪% পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করে চীন।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর ৭৮ শতাংশ প্রকল্পেই এসব বিরল ধাতুর প্রয়োজন হয়।
চীন অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় মার্কিন কোম্পানিগুলোর কাছে এই খনিজের সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। এমনকি মার্কিন প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের কাছে বৈধ আমদানি লাইসেন্স থাকা সত্ত্বেও, বেইজিংয়ের পরোক্ষ কঠোর বার্তার কারণে চীনা সরবরাহকারীরা আমেরিকায় এসব খনিজ পাঠানো কমাচ্ছে।
আমেরিকা যাতে নিজেরা বিকল্প উপায়ে এই খনিজ প্রক্রিয়াজাত করতে না পারে, সেজন্য চীন সরাসরি আমেরিকার প্রধান রেয়ার-আর্থ খনি কোম্পানি MP Materials এবং USA Rare Earth-সহ মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম নির্মাতা বোয়িং, লকহিড মার্টিন ও জেনারেল ডাইনামিক্সের মতো জায়ান্ট কোম্পানিগুলোকে ব্ল্যাকলিস্ট বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
এর ফলে আমেরিকার প্রতিরক্ষা কারখানায় নতুন উন্নত অস্ত্র ও মিসাইল তৈরির কমে যায়।
চীন খুব ভালো করেই জানে, আমেরিকার মাটিতে মিসাইল ফেলার কোনো প্রয়োজন নেই; তাদের অস্ত্রের কারখানায় কাঁচামাল আটকে দিলেই তাদের যুদ্ধ করার ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়বে।
অস্ত্রের মজুদ শেষ, আর নতুন অস্ত্র তৈরির কাঁচামাল চীনের পকেটে—এমন এক চরম ফাঁদে পড়ে ওয়াশিংটন বুঝতে পেরেছে যে, ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালানো মানে নিজেদের সামরিক পরাশক্তি হিসেবে অবস্থানকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলা।
চীন সরাসরি যুদ্ধে না নেমেও তার অর্থনৈতিক ও খনিজ সম্পদের একচেটিয়া ক্ষমতা ব্যবহার করে আমেরিকাকে কোণঠাসা করেছে এবং ইরানকে এক নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চীন যে শুধু মুখের কথায় নয়, বরং কাজের মাধ্যমে মিত্রের পাশে দাঁড়ায়—এই ঘটনা তারই এক জীবন্ত প্রমাণ।
আমেরিকা বারবার ইরানি পণ্য কিনলে শুল্ক আরোপের হুঁশিয়ারি দিলেও চীন তাতে কান দেয় না। কারণ, চীনের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলে চীনও আমেরিকায় রেয়ার আর্থের সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে পারে। এমনটা হলে আমেরিকার সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। আর চীনের ক্রয় করা ইরানি তেলের অর্থ দিয়ে ইরান তার সামরিক শক্তিকে এগিয়ে নিচ্ছে।
Author: Saikat Bhattacharya