USA vs China

চীন কিভাবে ইরানকে সাহায্য করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইস্রাইলের বিরুদ্ধে

17-March-2026 by east is rising 20

ইরান যেভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে যুদ্ধে পরাস্ত করছে তাতে একটা বিষয় পরিষ্কার যে চীন অনেকগুলো অস্ত্র প্রযুক্তিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাপিয়ে গেছেঃ

১) হাইপারসোনিক মিসাইল প্রযুক্তি পশ্চিমের কোন দেশের কাছেই নেই। ২০২১ সালে চীন হাইপারসোনিক গ্লাইডার টেস্ট করে যা মার্কিন সমরবীদদের ঘুম কেড়ে নেয়। ২০১৫ সালের ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞার লিস্টে মিসাইল প্রযুক্তি ছিলনা। চীন ও রাশিয়া যে ইরানে আইনীভাবেই মিসাইল প্রযুক্তি পাঠাতে পারবে ও পারছে তা মার্কিন সরকার জানতো। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বুঝে উঠতে পারেনি যে চীন তার লেটেস্ট প্রযুক্তির একটা বড়ো অংশ ইরানকে এই সুযোগে দিয়ে দেবে। মার্কিন সমরবীদেরা ইরানের মিসাইল সক্ষমতা দেখে হতবাক হয়ে গেছে।

২) চীন যে মার্কিন জিপিএস এর পালটা বেইদাউ স্যাটেলাইট কন্সটেলেশন নেভিগেশন গড়ে তুলছে তা জানাই ছিল। ২০২৩ নাগাদ এটাও পরিস্কার হয়ে গেছিল যে বেইদাউ জিপিএস-এর থেকে প্রযুক্তির দিক থেকে অনেক এগিয়ে। বেইদাউ জিপিএস-এর থেকে অনেক ভালোভাবে যে কোন বস্তু বা মানুষের সঠিক স্থান ও কাল নির্ণয় করতে পারে। ফলে মার্কিন নৌসেনার অবস্থান সহজেই ইরান জেনে যাচ্ছে।

একই ভাবে ইরানের মিসাইলের লক্ষ্যও হচ্ছে অব্যর্থ। এমন প্রিসিশন মিসাইল আক্রমণ এর আগে বিশ্ব দেখেনি। ইউক্রেইন যুদ্ধে রাশিয়ার প্রিসিশন মিসাইল আক্রমণের দুর্বলতা অজস্রবার উঠে এসেছে। হয়তো ইউক্রেইন যুদ্ধ স্টাডি করেই চীন বেইদাউ দিয়ে প্রিসিশন মিসাইল আক্রমণের দিকটা শক্তিশালী করে তুলেছে। যার সুফল পাচ্ছে ইরান।

এছাড়া বেইদাউ শর্ট মেসেজ বা সীমিত আকারের তথ্য পাঠাতে সক্ষম কোন ফোন সিগ্নাল ছাড়াই। এই জন্যেই বেইদাউ মার্কিন র‍্যাডার ও গ্রাউন্ড স্টেশনগুলোকে ফেক সিগ্নাল দিতে সক্ষম হচ্ছে যার ফলে ইরানের মিসাইলকে অনেক সময়েই স্বপক্ষের মিসাইল ভাবছে আবার মার্কিন বা ইস্রাইলি মিসাইল বা ইন্টারসেপ্টরকে বিপক্ষের পাঠানো শত্রু বস্তু ভাবছে। মার্কিন জিপিএস এমন কিছুই করতে পারেনা।

৩) এছাড়া চীনা কম্পানী জিলিন-১ অবসারভেশন কন্সটেলেশন হিসেবে কাজ করে যা পৃথিবীতে স্থায়ী বা ভ্রাম্যমাণ যে কোনো কিছুরই ভিডিও বা ফটো তুলতে পারে রিমোট সেন্সিং স্যাটেলাইট দ্বারা। ফলে মার্কিন ও ইসরাইলী সেনা ঘাটি, গুপ্তচর ঘাটি, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির চলাচল সবই ইরানী সমরবীদদের কাছে ধরা পড়ে যাচ্ছে। এই প্রথম কোনও যুদ্ধে মার্কিন সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায় রয়েছে। মার্কিন কম্পানী ম্যাক্সার জিলিন-১ -এর থেকেও ভালো ভিডিও ও ফটো দিতে সক্ষম বিশেষ করে মেঘলা আবহাওয়াতে। আপাতত মেঘলা আবহাওয়া নেই আর তাই এই খেলায় ইরান এখন মার্কিন ও ইস্রাইলকে সমানে সমানে টক্কর দিচ্ছে। আর ইরান যে এই সুবিধে পাবে এটা মার্কিন সমরবীদেরা চন্তা করেনি বলে মার্কিন ইস্রাইল জোট বেকায়দায় পড়ে গেছে।

৪) চীন যদি ইরানকে হাইপারসোনিক গ্লাইডার প্রযুক্তি দিতে পারে তাহলে এন্টি-শিপ মিসাইল প্রযুক্তি না দেওয়ার কারণ নেই। এই ধারণা আরও বদ্ধমূল হয়েছে ইরানের নৌসেনার সংগঠন দেখে। ইরানী নৌসেনা বড় বড় যুদ্ধ জাহাজের ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং অজস্র খুদ্র বোট কেন্দ্রিক। সেখান থেকে এন্টি-শিপ মিসাইল ব্যবহার করে বড় যুদ্ধ জাহাজে আঘাত করার কৌশল গ্রহণ করাই ইরানের লক্ষ্য হবে বলে মনে করছে মার্কিন সমরবীদেরা। হরমুজ খাড়ি সঙ্কীর্ণ এবং অগভীর (নাব্যতা মাত্র ২০০ মিটার)। তাই বৃহৎ মার্কিন জাহাজকে সঙ্কীর্ণ অগভীর খাড়িতে অসংখ্য খুদ্র বোট থেকে চীনা YJ-21 হাইপারসনিক মিসাইলের মতো জাহাজ-বিধ্বংসী মিসাইল নিক্ষেপ করলে করুণ পরিণতি হবে মার্কিন নৌসেনার। এই দ্রুতগামী এন্টি-শিপ মিসাইলের কোনো জবাব মার্কিন নৌসেনার নেই।

৫) ইরান কিন্তু মার্কিন ইস্রাইলের তুলনায় ইন্টারসেপ্টর ও ফাইটার জেটের ক্ষেত্রে শুধু পিছিয়েই না প্রায় শূন্য। রাশিয়া S-400 দেয়নি ইরানকে। S-300 ভেনেজুয়েলা ও ইরান দুই জায়গাতেই ব্যর্থ। ইরানের নিজস্ব BAVAR-4-ও খুব ফলদায়ক লাগেনি। চীনের এইচ কিউ-৯ ইরান নিয়েছিল পাকিস্তানে ভারতের মিসাইলের বিরুদ্ধে তার পারফরমান্স দেখে। কিন্তু ইরানে সেভাবে সফল হয়নি। অবশ্য মিসাইল ইন্টারসেপ্টর হিসেবে অসফল হোলেও মার্কিন ও ইস্রাইলী ফাইটার জেটগুলোকে ভালোই বেগ দিয়েছে ইরানী মিসাইল ও ইন্টারসেপ্টর। ইরানের নিজস্ব শক্তিশালী বিমান বাহিনী না থাকাটা ইরানের জন্য আরেকটা সমস্যা।

৬) বেইদাউ জিনিল-১ ও হাইপারসোনিক প্রযুক্তির জোড়ে বিমান বাহিনী না থাকার সমস্যাটা আক্রমণের ক্ষেত্রে কাটিয়ে ওঠা গেলেও রক্ষণের ক্ষেত্রে কাটাতে পারেনি ইরান। ইরানের জমি তাই অরক্ষিতই থাকছে। তবে এই সমস্যা মেটাতে ইরান ভূগর্ভস্থ শহর বানিয়ে রেখেছে অনেকগুলো। ভূগর্ভস্থ শহর থেকে বা সমুদ্রের তলদেশের নীচ থেকেও সরাসরি মিসাইল ছুড়ে যাচ্ছে ইরান। এই সক্ষমতার জন্যে মিসাইল লঞ্চার ধ্বংস করার মার্কিন ইস্রাইলী কৌশল পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়াও চীন থেকে বিপুল পরিমাণে ফেক সমরাস্ত্র বা ডিকয় ব্যবহার করে প্রচুর মার্কিন ইস্রাইলী মিসাইলকে নষ্ট করিয়ে দেওয়াও হয়েছে।

এর পরে লিখব চীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ম্যনুফ্যাকচারিং ও ভারী শিল্পে ৩ গুণ এগিয়ে এবং এই এগিয়ে থাকা কিভাবে ইরানকে সুফল এনে দিয়েছে যুদ্ধে। মার্কিন অর্থনীতি যত উৎপাদন থেকে সম্পত্তি হাতবদলের ফাটকা কারবারে চলে গেছে, মার্কিন সমরবীদেরা তত বেশি সমরাস্ত্রের পরিমাণ ভুলে গুণমানের দিকে বেশি নজর দিয়েছে। চীন অন্যদিকে পরিমাণ ও গুণমান দুইই বাড়াতে পেরেছে কারণ ম্যান্যফ্যাকচারিং ও ভারী শিল্পে সে ৩ গুণ এগিয়ে। এর ফলে এখন বোঝা যাচ্ছে যে মার্কিন সমর কাঠামোর থেকে চীনের সমর কাঠামো পরিমাণে অনেক এগিয়ে গেছে আর গুণমানে ঘাটতি কমিয়ে ফেলেছে।

এর ফলে মার্কিন মিসাইল ইন্টারসেপ্টর প্রযুক্তি ও গুণমানে এগিয়ে থাকলেও পরিমাণে পিছিয়ে পড়ছে। যত খরচ হচ্ছে তত উতপাদন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। সেই উৎপাদনও আবার চীনের ম্যানুফ্যাকচারিং-এর ওপর নির্ভরশীল। মার্কিন সমরবীদেরা ১৯৯০-এর দশকে ইরাক ও যুগোস্লাভিয়া যুদ্ধ করে ভেবেছিল পরিমাণের গুরুত্ব কমিয়ে গুণমানকে এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব যে পরিমাণ গুরুত্বহীন হয়ে যাবে। যেমন- প্রিসিশন মিসাইল একটা মারবে, সঠিক জায়গায় মারবে এবং লাগবে কিন্তু অনেক মিসাইল এবরো খেবরো ভাবে মারবে কিন্তু সঠিক জায়গায় লাগবেনা। অর্থাৎ একটা গুলি শত্রুর মাথায় মেরে কাজ সাড়া হল বনাম অনেকগুলো গুলি চালিয়েও শত্রুর হাত পায়ে লাগলো এবং বেঁচে গেল। কিন্তু এই ধারণার ওপর নির্ভর করেই মার্কিন সেনা আজ ডুবতে বসেছে। এর কারণ শত্রুরা পরিমাণ বাড়িয়ে গুণমান বাড়িয়েছে আর তারা পরিমাণের মূল্যে গুণমান বাড়িয়েছে।

বলা বাহুল্য জাপান ও জার্মানিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ভেবেছিল বিশাল মার্কিন ম্যানুফ্যাকচারিং-এর সামনে পরিমাণে দাঁড়ানো যাবেনা আর তাই পরিমাণের ঘাটতি পুষিয়ে দেবে গুণমান দিয়ে। এই ধারণা সেদিনও ভুল প্রমাণিত হয়েছিল এবং আজও তাই হল। ইরানের হাজার ডলার ড্রোন বনাম মার্কিন ইস্রাইলী মিলিয়ন ডলারের ইন্টারসেপ্টর-এর লড়াই তাই ইরানকেই এগিয়ে দিচ্ছে। আবার দুর্বল ম্যানুফ্যাকচারিং-এর জন্যে মার্কিনীদের পক্ষে নতুন ইন্ট্রাসেপ্টর, মিসাইল, রাডার স্টেশন, বিমান ঘাটি তৈরি করা কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ম্যানুফ্যাকচারিং-এর জোড় ছাড়া কেবল পেপারে লেখা প্রযুক্তির জোড়ে শক্তিশালী সমর বাহিনী অসম্ভব। যদিও স্বল্প মূল্যের লেসার প্রযুক্তির জোড়ে আগামীদিনে ইরানী স্বল্প মূল্যের ড্রোনকে কাউন্টার করার কথা ভাবছে মার্কিন ইস্রাইল, কিন্তু চীনও আবার স্বল্প মূল্যের স্টিল নির্মিত হাইপারসোনিক মিসাইল প্রস্তুত করছে যা ইরান অবশ্যই পাবে যদি যুদ্ধ চলতে থাকে।

এছাড়া আরেকটা বিষয় খুব পরিস্কার হল যা সমরবিদেরা চিরকালই বলত। মার্কিন সমর ঘাটি ও এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারগুলো মূলত সিটিং ডাক মানে অনায়াসে মিসাইল দিইয়ে শেষ করে দেওয়া সম্ভব। এগুলো পুলিশিং করতে এবং ডিটারেন্ট হিসেবে কাজ করতে সক্ষম। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে এগুলো শক্তিশালী স্যাটেলাইট গাইডেড প্রিসিশন মিসাইলের অসহায়। নিকোলাস চাইলান-এর মতো মার্কিন বিনাম বাহিনীর এ আই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) সমরবীদ এগুলোকে সিটিং ডাক বলে চিহ্নিত করে পদত্যাগ করেন ২০২১ সালে। নিকোলাস জানান যে পেন্টাগন বিশ্ব জুড়ে সমর ঘাটি, এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার ও আদীম বৃহৎ যুদ্ধ জাহাজে ফালতু খরচ করে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেন্দ্রিক সমরাস্ত্র বানাবার জন্য অর্থ বরাদ্দ হয় খুবই কম। চীনা সমরবীদেরাও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সমর ঘাটি ও বৃহৎ যুদ্ধ জাহাজ বানানোকে সঠিক পথ বলে মনে করেনা। চীনা সমরবীদদের মতে পেন্টাগন মূলত অর্থ তছরুপ করতে এগুলো করে। এই কারণেই ২০০৪ সালের পর থেকে পেন্টাগনের কোন অডিট করা হয়না।

Author: Saikat Bhattacharya


You may also like