From the Facebook Page of "War and History Insights (WHIS)"
চীনের আধুনিক যুদ্ধবিমান কর্মসূচি এখন এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। মাত্র ১০ মাস আগে প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে প্রকাশ পাওয়া তাদের ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান প্রকল্প ইতিমধ্যেই চমকপ্রদ অগ্রগতি অর্জন করেছে। সম্প্রতি চেংডু এয়ারক্রাফট কর্পোরেশনের নতুন প্রোটোটাইপটির বেশ কিছু ছবি প্রকাশ পেয়েছে যা এখন পর্যন্ত চীনের সবচেয়ে উন্নত যুদ্ধবিমান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। চাইনিজ এই বিমানটি “জে-৩৬ (J-36)” নামে পরিচিত। এই বিমানের বিশেষত্ব হলো এর লেজবিহীন নকশা (tailless design) এবং তিনটি ইঞ্জিন (triple-engine layout)—যা বিশ্বের অন্য কোনো কার্যকর ফাইটার জেটে এখনো দেখা যায়নি।
সমরাস্ত্র বিশেষজ্ঞদের মতে, লেজবিহীন নকশা ফাইটার জেটটির স্টিল্থ ক্যাপাসিটি ও গতিকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। যদিও এতে বিমান উড়ার সময় এবং উড্ডয়ন কালে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকে। তবে এই সমস্যা মোকাবেলায় চীনা প্রকৌশলীরা যুক্ত করেছেন কৌণিক থ্রাস্ট-ভেক্টরিং নজল (Angled Thrust-Vectoring Nozzles), যা বিমানটির টেক অফের সময় ও হাই অলটিটিউডে কর্মক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে বিমানটি উচ্চগতিতে উড়তে এবং হঠাৎ দিক পরিবর্তন বা ডগফাইটে টিকে থাকার পুরো সক্ষমতা পাবে।
জে-৩৬-এ নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে ডোরসাল ও ডুয়াল বটম এয়ার ইনটেক, যা এখন ডাইভার্টারলেস সুপারসনিক ইনলেট (DSI) প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। এই প্রযুক্তি বিমানটিকে রাডারে কম দৃশ্যমান করে তোলে, অর্থাৎ স্টিলথ ক্ষমতা বাড়ায়। এছাড়া নতুন ল্যান্ডিং গিয়ার ডিজাইন–এ চাকাগুলো পাশাপাশি স্থাপন করা হয়েছে, যা আগের সংস্করণের তুলনায় অধিক ভারসাম্যপূর্ণ ও স্থিতিশীল অবতরণ নিশ্চিত করবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জে-৩৬-এর দ্রুত আপডেট প্রমাণ করছে যে চীন একটি ত্বরান্বিত পুনরাবৃত্তিমূলক (Accelerated Iterative) প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে। অর্থাৎ, প্রতিটি উড্ডয়ন পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করে তাৎক্ষণিকভাবে ডিজাইনে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। যা যুক্তরাষ্ট্রের উন্নয়ন পদ্ধতির সাথে অনেকটা সাদৃশ্যপূর্ণ। এর ফলে বিমানটি দ্রুত উৎপাদন-প্রস্তুত (production-ready) অবস্থায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে এই পরিবর্তনগুলো সম্ভবত বিমানের স্থিতিশীলতা, স্টিলথ ও ম্যানুভারেবিলিটির ডেভেলপ করার জন্যই করা হয়েছে। কারন চীনের লক্ষ্য একটাই—আকাশে মার্কিন আধিপত্যের মোকাবিলা করা।
তবে ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের ক্ষেত্রে জে-৩৬ একাই রয়েছে তা কিন্তু নয়। শেনইয়াং এয়ারক্রাফ্ট কর্পোরেশনও সমান্তরালভাবে তাদের নিজস্ব ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান, জে-৫০ (J-50), তৈরি করছে। সম্প্রতি এই বিমানেও গুরুত্বপূর্ণ ডিজাইন পরিবর্তন দেখা গেছে। দুটি কোম্পানির এই সমান্তরাল প্রচেষ্টা দেখায় যে চীন ভবিষ্যতের আকাশযুদ্ধের প্রযুক্তি আয়ত্ত করতে একযোগে বহু দিক থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে। এক কথায়, এটি চীনের সামরিক শিল্পের দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের একটা নমুনা মাত্র।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রও বসে নেই। তারা ইতোমধ্যে তাদের পরবর্তী প্রজন্মের যুদ্ধবিমান, F-47, তৈরির ঘোষণা দিয়েছে, যা বোয়িং (Boeing) নির্মাণ করছে। মার্কিন বিমান বাহিনীর প্রধান জেনারেল ডেভিড অ্যালভিন জানিয়েছেন, প্রথম F-47-এর উড্ডয়ন ২০২৮ সালে নির্ধারিত, এবং ২০২৯-৩০ সালের মধ্যে এটি অপারেশনাল হতে পারে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়েই বোয়িংকে প্রকল্পের নেতৃত্ব দেওয়া হয়। যদিও জানা গেছে যে ২০১৯ সাল থেকেই এর এক্স-ভার্সন গোপনে পরীক্ষা করা হচ্ছিলো। সুতরাং, যুক্তরাষ্ট্র যে খুব পিছিয়ে আছে সেটাও বলার কোন উপায় নেই। সমরাস্ত্র শিল্পে চীনের দ্রুত উন্নতি এবং তাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা দেখে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন যে, ভবিষ্যতেও যদি বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকে, তবে চীনের জে-৩৬ ও জে-৫০ সম্ভবত ২০৩১ সালের জানুয়ারির মধ্যেই কার্যকরী বাহিনীতে যুক্ত হতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের F-47 প্রকল্পের চেয়েও দ্রুত সময় চাইনিজ বিমান বাহিনীতে প্রবেশ করবে।
চীনের এই অগ্রগতি শুধু এক দেশের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়; এটি বৈশ্বিক আকাশ যুদ্ধের ভারসাম্যকেও বদলে দিতে পারে। লেজবিহীন, তিন ইঞ্জিনবিশিষ্ট এবং উন্নত স্টিলথ ক্ষমতাসম্পন্ন এই জে-৩৬ যদি সফলভাবে অপারেশনাল পর্যায়ে পৌঁছায়, তাহলে এটি ২১শ শতাব্দীর আকাশ যুদ্ধের নতুন সংজ্ঞা লিখে দিতে পারে।
[ অনুমতি ছাড়া কপি করা নিষেধ ]
Author: Saikat Bhattacharya