জেন জি বিপ্লব প্রসঙ্গে

12-September-2025 by east is rising 299

সাকিব - প্রঃ গোটা বিশ্ব জুড়ে যে যুব সমাজের অসন্তোষ ও বিদ্রোহ হচ্ছে তা কি কেবল মার্কিন সরকার করাচ্ছে?

সৈকত - উঃ মোটেই না। গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে কোনো অর্থনৈতিক বিকাস হচ্ছেনা সাধারণ মানুষের। ভোট ব্যবসায়ী রাজনীতিবীদেরা ও করপোরেটরা লুটে পুটে খাচ্ছে আর সাধারণ মানুষ কিছুই পাচ্ছেনা। ফলে মানুষের মধ্যে বিশেষ করে যুব সমাজের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হচ্ছে।

সাকিব - প্রঃ আন্দোলনগুলো এত কার্যকর হচ্ছে কিভাবে?

সৈকত - উঃ আন্দোলনে বাচ্চাদের সামনে রাখা হচ্ছে। বাচ্চাদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়া প্রাকৃতিক ভাবেই মানুষের পক্ষে কঠিম। তাই প্রশাসন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারছেনা। আর একটা দুটো কঠিন সিদ্ধান্ত এলেই সমাজ প্রচণ্ড রেগে যাচ্ছে কারণ বাচ্চাদের ওপর জুলুম করা মানুষের পক্ষে প্রাকৃতিক ভাবেই কঠিন। ফলে বাচ্চাদের আন্দোলনকে দমন করা অপেক্ষাকৃত কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এর সাথে যদি বিরোধী কোনও দম বা গোষ্ঠি আন্দোলনে যোগ দেয় তাহলে আন্দোলন হয়ে যাচ্ছে অপ্রতিরোধ্য। অনেক সময় প্রশাসনের লোকও মদত দিয়ে থাকে। অথবা আন্দোলন জয়ের গন্ধ পেলেই প্রশাসনের লোকেরাও পালটি মারছে।

সাকিব - প্রঃ এই আন্দোলনগুলো-কে কি বিপ্লব বলা যায়?

সৈকত - উঃ অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতকের প্রথম দিকে বিপ্লব করেছিল মধ্যবিত্ত শ্রেণি। উনবিংশ শতকের মধ্যভাগ থেকে বিপ্লবী আন্দোলনে যোগ দেয় সংগঠিত শ্রমিক শ্রেণি। বিংশ শতকে কৃষক ও উপনিবেশ বিরোধী জনতাও যোগ দেয়। আজকের একবিংশ শতকে এরকম কোনও শ্রেণি নেই যে বিপ্লবকে ধারণ করবে। কিন্তু সমাজের মধ্যে ক্ষোভ আছে শাসক শ্রেণির প্রতি। রক্ত গরম যুব সমাজই এই ক্ষোভকে আন্দোলনে পরিণত করছে। ১৩ থেকে ১৮ বছরের বাচ্চারাও তাদের সাথে যোগ দিচ্ছে। এর একটা কারণ হতে পারে সামাজিক মাধ্যমের দৌলতে বাচ্চারাও এখন আয় করে বা আয় করার ইচ্ছে পোষণ করে। ফলে সমাজের ভালো খারাপের সাথে তাদের আয়ের ভালো খারাপ হওয়া মিশে থাকে। তাই তারা আন্দোলনে এগিয়ে আসছে। বলা যায় আন্দোলনের একটা নতুন এজেন্ট আবিষ্কৃত হয়েছে। কিন্তু এই নতুন এজেন্ট এখনো যথার্থ অর্থে বিপ্লব করে উঠতে পারেনি। কারণ তারা শাসক হটাতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে এসেছে বটে, কিন্তু নতুন নীতি তৈরির ব্যপারে এখনো তাদের কাছ থেকে কোন পরিষ্কার রূপরেখা পাওয়া যাচ্ছেনা।

সাকিব - প্রঃ তাহলে কি মার্কিন কোনও প্রভাব নেই?

সৈকত - উঃ মার্কিন সরকার বিভিন্ন দেশে দেশে শাসকদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেনা আর অর্থ ও অস্ত্রের জোড়ে। ২০০৭-এর বিশ্ব মন্দা ও ইরাক আফঘানিস্তান যুদ্ধে করুণ পরাজয় থেকেই মার্কিন সরকার বুঝে গেছে যে অধিকাংশ দেশের শাসক শ্রেণিই আর তার নিয়ন্ত্রণে থাকবেনা। কারণ চীন প্রায় সমস্ত দেশেরই বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। ফলে চীন থেকেই তারা অধিকাংশ বাণিজ্য পায়। মার্কিন বাজার গুরুত্বপূর্ণ থাকলেও বিভিন্ন দেশ মার্কিন সরকারকে ঋণ দিয়ে সেই বাজার তৈরি করে। চীনে নতুন বাজার তৈরি হচ্ছে এবং একদিন আসবে যখন বিশ্বের অধিকাংশ দেশই চীনেই রপ্তানী করবে আর মার্কিন সরকারকে ঋণ দেবেনা মার্কিন বাজার তৈরি করতে। যুদ্ধ করা যাচ্ছেনা আর বাণিজ্য দিয়েও যাচ্ছেনা। তাই মার্কিন সরকার মানুষকে শাসক শ্রেণির বিরুদ্ধে উসকে দিয়ে শাসক শ্রেণিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে সেই আরব বসন্ত থেকেই। এরকম আন্দোলনের ভয় দেখিয়ে পুরো নিয়ন্ত্রণ পাওয়া যায়না বটে কিন্তু যতটা লাগামহীন হয়ে যেতে পারত তা আটোকানো যায়। ২০১৬ সালেই বিভিন্ন দেশে বাচ্চা আন্দোলন করিয়ে মার্কিন সরকার ফলাফল পর্যালোচনা করেছিল। পরে এই বিদ্রোহ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু যে কোনও জায়গাতে চাইলেই মার্কিন সরকার সফল হবেনা। মানুষের রাগ চরম পর্যায় গেলে বা বিরোধী শক্তিগুলো সঙ্গ দিলেই কেবল সফল হবে। আর এই বাচ্চা দিয়ে বিদ্রোহ প্রযুক্তি মার্কিন ছাড়াও অন্যান্যরাও ব্যবহার করতে পারে এর কার্যকারিতা দেখে।

সাকিব - প্রঃ চীন কেন পালটা বিদ্রোহ করায়না?

সৈকত - উঃ চীন জানে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক দেশের ভোট ব্যবসায়ী রাজনীতিবীদেরা গণিকা সম। গণিকাদের মতোই ভোট ব্যবসায়ীদের কেনা যায়। চীন জানে যতদিন সে বিশ্বের প্রধান উৎপাদক, তার কাছে বাণিজ্য ও অর্থ ততদিন গণিকা সম ভোট ব্যবসায়ীরা তার আজ্ঞাবহই থাকবে। থাইল্যাণ্ড হোক বা শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ হোক বা অন্য যে কোন দেশ, বিদ্রোহের পরে কোনও দেশই চীন বিরোধিতা করেনি। চীন বিরোধিতা করেছে কেবল নির্বাচনে জিতে আসা শ্বেতাঙ্গবাদীরা (ইতালিতে, আরজেন্টিনায়, এস্টনিয়ায়)। শ্বেতাঙ্গবাদীরা ছাড়া পৃথিবীতে এমন কোনও শক্তি নেই যারা চীনের কাছে বিক্রি হবেনা। তাই চীন এসব বাচ্চা বিদ্রোহ নিয়ে ভাবিত নয়। চীন জানে ত্রিতীয় বিশ্ব যত বহুদলীয় গণতন্ত্রে থাকবে, তত উৎপাদন বিমুখ রাজনীতিতে মন দেবে, ততই বিশ্ব উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে চীন থেকে যাবে। তার ওপর চীন বলে বেড়াতে পারবে যে বহুদলীয় গণতন্ত্রে স্থিতিশীলতা আসেনা। আগামী ২০-২৫ বছর ধরে এরকম বিদ্রোহ ও অস্থিতিশীলতা থেকে গেলে একটা প্রজন্ম আসবে যারা বহুদলীয় গণতন্ত্রকে ঘৃণা করবে। ২০৪৯ সালে চীন নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালি দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। সবচেয়ে শক্তিশালি হতে গেলে বিশ্ব উৎপাদনের বৃহৎ অংশ চীনে তৈরি করতে হবে। মার্কিন বিদ্রোহ প্রযুক্তি উৎপাদনে অধিকাংশ দেশকে যত পেছনে ঠেলে দেবে চীনের পক্ষে বিশ্বের এক নম্বর শক্তি হওয়া ততই সহজ হবে।

সাকিব - প্রঃ তাহলে অধিকাংশ দেশে কি হবে?

সৈকত - উঃ আপাতত চতুর্থ শিল্প বিপ্লব আসার পরে অনুন্নত দেশে শিল্প করা প্রায় অসম্ভব হয়ে যাবে কারণ যাতায়াত খরচ, শক্তি খরচ এতটাই কমে যাবে ও শ্রমিকের উতপাদনশীলতা এতটাই বেড়ে যাবে যে স্বল্প মজুরির জোড়ে আর শিল্প টানা যাবেনা। কিছু শিল্প হবে খনিজ সম্পদকে কেন্দ্র করে এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনকে কেন্দ্র করে আভ্যন্তরীন বাজারের লক্ষ্যে। এইভাবে বিশ্ব উৎপাদন ব্যবস্থায় এগোনো সম্ভব নয় আর পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর পক্ষে। অনুন্নত দেশের শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে যে বিপুল বিনিয়োগ করতে হবে তাও পারবেনা এই সব বিদ্রোহে ব্যস্ত থাকবে বলে। চীন যদি রোবট গর্ভ আনতে সফল হয়ে যায় (২০২৬ সালে বাজারে আসবে) তাহলে এই প্রক্রিয়া আরও জোরদার হবে। এরকম হলে অনুন্নত আর কোনও দেশই উন্নত হতে পারবেনা। তবে দীর্ঘদিন ধরে এরকম পশ্চাদপদ থাকতে থাকতেই হয়তো নতুন বিপ্লবের বীজ জন্ম নেবে সেখানে। আপাতত গণতান্ত্রিক দেশগুলোয় কেবল লুট পাট বিদ্রোহ চলতে থাকবে। এই লুট পাট থেকেই হয়তো নতুন আদি পুঁজি আসবে। নতুন শ্রেণির জন্ম হবে যে বিপ্লব করবে।

Author: Saikat Bhattacharya


You may also like