USA vs China

ট্রাম্পের নীতি ও ক্ষয়িষ্ণু মার্কিন হেজিমনি

08-April-2025 by east is rising 480

ট্রাম্প জিতে আসার পর থেকে চারটে বিষয় পরিস্কারভাবে চাইছেঃ

১) মার্কিন ডলার-এর জায়গায় অন্য কোনো মুদ্রা আন্তর্জাতিক লেনদেনে ব্যবহার করলে সেই দেশ-কে অর্থনৈতিকভাবে শাস্তি দেওয়া হবে,

২) অন্যান্য দেশের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত আছে তা কমাতে হবে,

৩) মার্কিন ফেডারেল কর্মী সঙ্কোচন করে সরকারী ব্যয় কমাতে,

৪) গ্রীনল্যাণ্ড বলপূর্বক দখল করবে এবং প্রয়োজনে কানাডাকেও দখল করবে।

প্রথম বিষয় প্রমাণ করে ট্রাম্প মার্কিন হেজিমনি অক্ষত রাখতে চান আর সেই জন্যে অনু কোনও মুদ্রাকে আন্তর্জাতিক লেনদেনে জায়গা ছাড়তে রাজি নন।

দ্বিতীয় বিষয় বোঝায় যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অধিকাংশ দেশের সাথে যে বাণিজ্য ঘাটতি বজায় রেখে চলছিল, তা আর করতে চাইছেনা বা করতে পারছেনা। ঘুরিয়ে বলা যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে বিশ্ব চাহিদার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল তা আর থাকা সম্ভব হচ্ছেনা। প্রথম এবং দ্বিতীয় বিষয় কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে একই সাথে হওয়া সম্ভব নয়। অর্থাৎ মার্কিন ডলার আন্তর্জাতিক লেনদেনে আগের অবস্থানেই থাকবে কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে ফেলবে, এটা অর্থনৈতিকভাবেই সম্ভব নয়।

তৃতীয় বিষয় প্রমাণ করে মার্কিন সরকারের খরচ কমানো প্রয়োজন। অর্থাৎ মার্কিন বাজেট ঘাটতি কমানো গুরুত্বপূর্ণ এই মুহূর্তে।

চতুর্থ বিষয় প্রমাণ করে যে নিকটবর্তী অঞ্চল দখল করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জমি ও তার সাথে জনসংখ্যা ও অর্থনীতির পরিমাণগত বৃদ্ধি চাইছে ট্রাম্প। এই ক্ষেত্রে হয় সামরিক খাতে ব্যয় বাড়িয়ে কাজ হাসিল করতে হবে নয়তো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সামরিক এসেট উত্তর গোলার্ধে নিয়ে আনতে হবে। যদি তৃতীয় বিষয়কে মাথায় রাখি তবে বলা যায় অন্যান্য জায়গার সামরিক এসেট উত্তর গোলার্ধে মোতায়েন করা হতেই পারে বাজেট ঘাটতি না বাড়নোর জন্যে। আবার কর্মী সংকোচন করে যে আয় হল তা সামরিক খাতে খরচ করে বাজেট ঘাটতি এক রাখাও উদ্যেশ্য হতে পারে।

আমরা এবার দেখি কেন মার্কিন ডলার-কে আন্তর্জাতিক লেনদেনে আগের মতো শক্তিশালী রেখে দিলে মার্কিন বাণিজ্য ঘাটতি বিশ্বের অধিকাংশ দেশের সাথেই একি থাকবে বা বেড়ে যাবে? একটা দেশের মুদ্রা মূলত দুটো বিষয়-এর ঘনীভূত রূপঃ সামরিক ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা। সামরিক ক্ষমতার জোড়ে একটা নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে কর তোলার ক্ষমতা ছাড়া রাষ্ট্র তৈরি হতে পারেনা। আর রাষ্ট্র সেই সামরিক ক্ষমতার জোড়েই কেবল মুদ্রা প্রদান করতে পারে। রাষ্ট্রের সামরিক ক্ষমতাই কার্যত তার মুদ্রা ব্যবহার নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষ ও প্রতিষ্ঠানকে বাধ্য করে। কিন্তু একটা ফিয়াট মুদ্রার মূল্য কি হবে তা নির্ভর করে সেই মুদ্রা যেই রাষ্ট্র প্রদান করেছে তার অর্থনৈতিক অবস্থা কেমন তার ওপর।

অর্থনীতিকে আমরা দুই ভাগে ভাগ করতে পারিঃ প্রবাহমান উৎপাদন বা আয় ও সঞ্চিত সম্পদ যেমন কারখানা অফিস খামার স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণাগার স্বাস্থ্যকেন্দ্র ইত্যাদি। সাধারণত যেখানে উৎপাদন যত বেশি সেখানে সম্পদও তত বেশি। যদি কোনও রাষ্ট্রের অনেক রপ্তানী থাকে আমদানীর তুলনায় তবে তার বৈদেশিক আয় বেশি হবে। তেমনই যদি কোনও রাষ্ট্রের মানুষ বিদেশে গিয়ে অনেক রোজগার করে তার বড়ো অংশ দেশে পাঠায় তাহলেও রাষ্ট্রের বৈদেশিক আয় বাড়বে। তেমনই কোনও রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বিদেশীরা পুঁজি বা ঋণ লগ্নী করে সম্পদ বাড়ায়। আবার রপ্তানীর চেয়ে আমদানী বেশি হলে বৈদেশিক ব্যয় বাড়ে, দেশে কর্মরত বিদেশিরা বিদেশে আয়ের বড় অংশ পাঠিয়ে দিলেও আয় কমে আবার দেশের লগ্নীকারীরা বিদেশে লগ্নী করলে দেশের সম্পদ কমে। আয় বাড়লে বা কমলে বলে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বা বাণিজ্য ঘাটতি। আবার সম্পদে বিনিয়োগ বাড়লে বা কমলে বলে লগ্নি বা পুঁজি খাতে উদ্বৃত্ত বা ঘাটতি।

এবার আমরা এক বাক্যে বলতে পারতাম যে দেশের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ও পুঁজি খাতে উদ্বৃত্ত সবচেয়ে বেশি সেই দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা সবচেয়ে ভালো। এবং সেই দেশের মুদ্রাই আন্তর্জাতিক বাজারে চলবে। কিন্তু ব্যপারটা অনেক জটিল। দেখা যায় কোনও দেশের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত সবচেয়ে বেশি আবার অন্য কোনও দেশের পুঁজি খাতে উদ্বৃত্ত সবচেয়ে বেশি। যদি বিশেষ কোনও দেশের উৎপাদন (ও স্বাভাবিকভাবেই সম্পদ) অন্যান্য দেশের থেকে বেশি হয়, তাহলে সেই দেশের মুদ্রাই আন্তর্জাতিক বাজারে চলবে। অতএব সেই মুদ্রার চাহিদা ও মূল্য অনেক বেশি হবে। যদি মুদ্রার মূল্য বেশি হয় তাহলে সেই দেশের উৎপাদিত পণ্য পরিষেবা ও সম্পদের মূল্যও বেশি হবে অন্যান্য দেশের তুলনায়। মজার ব্যপার হল উৎপাদন-এর মূল্য বেড়ে গেলে চাহিদা কমে যায় ও চাহিদা কমে গেলে উৎপাদনও কমে যায়। অথচ সম্পদের মূল্য বেড়ে গেলে চাহিদা বেড়ে যায় এবং সম্পদে আরও বেশি বিনিয়োগ এসে সম্পদের মূল্য ও পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। অর্থাৎ যেই দেশের মুদ্রা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তার উৎপাদন বিদেশী উৎপাদনের কাছে প্রতিযোগিতায় পরাস্ত হবে আর তার সম্পদের বাজারে আরও বেশি পুঁজি ও ঋণ আসতে থাকবে। অতএব তার বাণিজ্য ঘাটতি বাড়বে আর পুঁজি খাতে উদ্বৃত্ত বাড়বে। অর্থাৎ সেই দেশে উৎপাদন কম হবে কিন্তু সেই দেশ বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে ঋণ নিয়ে অন্যান্য দেশের উৎপাদন কিনে যাবে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা প্রদানকারী দেশটা যত দিন অন্যান্য দেশের তুলনায় অর্থনীতিতে অনেক বড় থাকে, ততদিন সমস্যা হয়না। কিন্তু যখন এক বা একাধিক বড়ো অর্থনীতি বাজারে থাকে তখন আন্তর্জাতিক মুদ্রা প্রদানকারী দেশটা কয়েকটা বড় অর্থনীতি সম্পন্ন দেশের দেওয়া ঋণ বা বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। শুধু তাইই না, আন্তর্জাতিক মুদ্রা প্রদানকারী দেশ মনে করতে থাকে যে একটা সময় ওই বড় অর্থনীতিগুলো বাড়তে বাড়তে এত বড় হয়ে যাবে যে তার সম্পদের পরিমাণও অনেক বেড়ে যাবে। তখন তারা সমস্ত বিনিয়োগ তুলে নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা প্রদানকারী দেশ-কে দেউলিয়া করে দিতে পারে।

তাই দেউলিয়া হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পেতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা প্রদানকারী দেশ নিজের মুদ্রার অবমুলয়ায়ণ ঘটিয়ে নিজের উৎপাদন-এর মূল্য কমিয়ে চাহিদা বাড়িয়ে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে পারে। ১৯৭১ সালে ব্রেটনুডস চুক্তি ভেঙ্গে পড়ে ডলারের অবমূল্যায়ণ ঘাটনোর ফলে। আবার বাণিজ্য উদ্বৃত্তে থাকা দেশ যদি নিজের মুদ্রার মূল্য আন্তর্জাতিক মুদ্রার তুলনায় বাড়িয়ে দেয়, তাহলেও তার উৎপাদন-এর চাহিদা কমে যাবে এবং বাণিজ্য উদ্বৃত্ত কমে যাবে। ১৯৮৫ সালে জাপান নিজের মুদ্রার মূল্য বাড়ায় অনেকটা ডলারের তুলনায় যাকে প্লাজা একরড চুক্তি বলে। মনে রাখা দরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭১ সালে ডলারের অবমূল্যায়ন ঘটিয়ে পশ্চীম জার্মানি ও জাপানের মার্কিন দেশে করা বিনিয়োগের মূল্য কমিয়ে দেয়, আবার ১৯৮৫-তে জাপান-কে মুদ্রার মূল্য বাড়াতে বাধ্য করে। মার্কিনীরা এইভাবে এক তরফা ডলারের অবমূল্যায়ণ করতে পেরেছিল কারন জার্মানি ও জাপানের নিজস্ব সামরিক জোড় ছিলনা। তাই মার্কিন আদেশ মেনে নিতে তারা বাধ্য ছিল।

কিন্তু ২০২৪ সালে এসে দেখা যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সবচেয়ে বেশি বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বজায় রাখা দেশ হল চীন যার নিজস্ব শক্তিশালী সেনাবাহিনী আছে। শুধু তাইই না, জাপান ও জার্মানি-র উৎপাদন যেখানে কখনৈ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাপিয়ে যায়নি, চীনের উৎপাদন সেখানে মার্কিন উৎপাদনকে ছাপিয়ে গেছে। বর্তমানে চীনের শিল্পোৎপাদন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের থেকে ৩ গুণ বড়ো। ক্রয় ক্ষমতার সমতায় (Purchasing Power Parity) মাপলে চীনের মোট উৎপাদন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ২৩% বেশি। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল জাপানের জনসংখ্যা যেহেতু মার্কিন দেশের তুলনায় মাত্র এক তৃতীয়াংশ আর জার্মানি এক-পঞ্চমাংশ, তাই জাপান বা জার্মানির পক্ষে কোনও দিনই মার্কিন অর্থনীতিকে ছাপিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। অন্য দিকে, চীনের জনসংখ্যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চার গুন বেশি। তাই চীনের অর্থনীতি- উৎপাদনে এবং সম্পদে- মার্কিন অর্থনীতিকে ছাপিয়ে যাবে সেটাই স্বাভাবিক।

ট্রাম্প জানে যে জাপান বা জার্মানির মতো চীন মার্কিন আদেশ শুনবেনা। চীন এমনিতেই মার্কিন সম্পদের বাজারে বিনিয়োগ কমিয়ে দিয়েছে অনেক। ২০২৪-এ যা ৭৫০ বিলিয়ন ডলার, ২০১১-এ ছিল ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলার। অথচ বিসাল বাণিজ্য উদ্বৃত্ত চীনের পক্ষে রয়েই যাচ্ছে। ট্রাম্প তাই ভুল গড় শুল্ক হর বের করেছেন সেই দেশের মার্কিনীদের সাথে থাকা বাণিজ্য উদ্বৃত্তকে সেই দেশের মার্কিন বাজারে করা রপ্তানী দিয়ে। তারপর সেই ভুল গড় শুল্কের অর্ধেক শুল্ক সেই দেশের ওপর চাপিতা দিয়েছে। ভিয়েতনাম কাম্বোডিয়া বাংলাদেশ ভারত-এর মতো বহু অর্থনীতি আছে যাদের কাছে মার্কিন বাজার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তারা মার্কিন আমদানীর ওপর শুল্ক কমিয়ে মার্কিন দেশের সাথে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত কমাতে সচেষ্ট হবে। কিন্তু মনে রাখা দরকার মার্কিন ডলারের মূল্য অত্যন্ত বেশি তা আন্তর্জাতিক মুদ্রা বলে। আর তাই শুল্কের হার কমালেও এই সব দেশের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত খুব একটা নাও কমতে পারে। তখন হয়তো ট্রাম্প এই দেশগুলোকে বলবে তাদের প্রয়োজন নেই এমন মার্কিন পণ্য আমদানী করতে কেবল মার্কিনীদের বৈদেশিক আয় বাড়াতে। এরকম সময়ে কিন্তু বলাই ট্রাম্প উৎপাদন বিক্রি করে আয় করছেন না, বরং বল পূর্বক এই সমস্ত দেশের বৈদেশিক আয় কেড়ে নিচ্ছেন। উল্লেখ্য ১৭৫৭ সালে ব্রিটেন কিন্তু বাংলার সাথে "পলাশী যুদ্ধ" করেছিল ব্রিটেনের সাথে চলা বাংলাত বাণিজ্য উদ্বৃত্তকে বল পূর্বক বাণিজ্য ঘাটতি বানাতে। ব্রিটেন পলাশীর যুদ্ধ জেতার পরেই বাংলার হস্ত শিল্প ধ্বংস করে ব্রিটেনের উৎপাদনের বাজার তৈরি করে বাংলায় এবং বাংলার পণ্য ব্যবহারকারী বিশ্বে। চীনের সঙ্গে ১৮৩০-এর দশকে বাণিজ্য ঘাটতি কাটাতে চীনে আফিম বিক্রি শুরু করে ব্রিটেন। আফিম কেনায় বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি হওয়ায় এবং চীনের সমাজে আফিমের ক্ষতিকর প্রভাব পড়ায় চীনের ছিং সম্রাট আফিম বিক্রি বন্ধ ঘোষণা করলে, ব্রিটেন আফিম বিক্রি করতে না দেয়ার বিরুদ্ধে "আফিম যুদ্ধ" শুরু করে। তাই ট্রাম্প-এর বিশ্ব থেকে বল পূর্বক বৈদেশিক আয় হাতাবার নীতি আসলে খুবই পুরনো পশ্চীমা নীতি।

মূল বিষয় হল ট্রাম্প জানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যত পরিমাণে ঋণ নিচ্ছে বিশ্ব বাজার থেকে তত পরিমাণে আয় করছেনা। ডলার আন্তর্জাতিক মুদ্রা বলে ঋণ করে ব্যয় করে চলেছে মাত্র। এখন ডলারের উচ্চ মূল্যের জন্যে প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদন করতে পারবেনা মার্কিনীরা। তাই বল পূর্বক ক্রয়ের অযোগ্য উৎপাদন বল পূর্বক চাপিয়ে দিয়ে অন্যান্য দেশের বৈদেশিক আয়েরন অংশ ছিনিয়ে আনলে ঋণ ও আয়-এর অনুপাত সামঞ্জস্যপূর্ণ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। বলা বাহুল্য গ্রীনল্যাণ্ড ও কানাডা বল পূর্বক দখল করার পেছনেও একই অভিসন্ধি। অন্যের আয় ও সম্পদ ছিনিয়ে নিয়ে ঋণ ও আয়-এর অনুপাত সামঞ্জস্যপূর্ণ করা। পশ্চীমের ইউরোপের দেশগুলো যেমন পর্তুগাল স্পেন হল্যাণ্ড ব্রিটেন ফ্রান্স এশীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি দূর করতেই কখণো রাজ্য দখল করে উপনিবেশ করত, কখনো জল দষ্যুগিরি করত, কখনো যুধে বন্দী মানুষকে দাস হিসেবে বিক্রি করত। ট্রাম্প মূলত সেই নীতিতে আবার ফিরছে।

আয় বাড়াবার আরেকটা উপায় হল সরকারী ব্যয় সঙ্কোচন। কিন্তু সামরিক ব্যয় সঙ্কোচন করলে মার্কিন হেজিমনি ও ডলারের রাজত্ব ধরে রাখা সম্ভব নয়। তাই কোপ পড়েছে সরকারী কর্মীদের ওপর। সরকারী কর্মী কমিয়ে আবারও সেই ঋণ আয়ের অনুপাত ঠিক করা। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন মার্কিন সরকারের ঋণ যেভাবে বাড়ছে আয়ের তুলনায় তাতে দেউলিয়া হওয়া সময়ের ব্যপার মাত্র। তাই সাধারণ মধ্যবিত্ত মার্কিনী ও দুর্বল দেশকে লুটে আয় বাড়ানোই ঠিক মনে করছেন ত্রাম্প।

এর অনিবার্য পরিণতি কি? অনেক মানুষ বিশেষ করে ট্রাম্প নিজে প্রায়ই বলে বেড়াছেন যে এর ফলে বিদেশি আমদানী আর মার্কিন ক্রেতা কিনবেনা বরং দেশীয় বিকল্প পণ্য-এর ক্রেতা বাড়বে এবং মার্কিন উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু বিষয়টা এত সহজ না। শুল্ক চাপালে বিদেশি আমদানিকৃত পণ্যের মূল্য বাড়বে মার্কিন বাজারে। পণ্যের মূল্য বাড়লে, চাহিদা কমে। অর্থাৎ পণ্যের বাজার কমবে। যদি বাজারে মার্কিন বিকল্প আসেও তার মূল্য শুল্ক চাপানোর আগের আমদানীর চেয়ে বেশি হবে। ফলে চাহিদা ও বাজার কমছেই। তবে বেশি সম্ভাবনা অন্য কোনও দেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্য শুল্ক চাপানো দেশজাত পণ্যের বিকল্প হয়ে উঠবে। অবশ্যই তাহলেও পণ্যের মূল্য বাড়বে এবং বাজার কমবে। এতে কেবল শুল্ক চাপানো দেশের উৎপাদন অন্য দেশে চলে যাবে তাই নয়, মোট চাহিদা কমে যাওয়ায় নতুন উৎপাদনের দেশেও উৎপাদন কমবে আগের দেশে যত উৎপাদন হত সেই তুলনায়। ফলে বিশ্ব উৎপাদন কমবে। ফলে বিশ্বের আয় কমবে এবং এর ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব থেকে যে আয় করত তা কমবে। ফলে মার্কিন উৎপাদনও কমবে। বিশ্ব উৎপাদন ও মার্কিন উৎপাদন কমবে এবং মার্কিন বাজারে দ্রব্য মূল্য বাড়বে ফলে মুদ্রাস্ফীতি হবে। এর ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বাড়বে। এর ফলে মার্কিন উৎপাদনে বিনিয়োগ কমবে আবার মার্কিন সম্পত্তি হস্তান্তরের ব্যবসা লাভজনক হয়ে উঠবে। বিশ্বের সমস্ত পুঁজি ছুটবে মার্কিন সম্পত্তি ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করতে ফলে মার্কিন ডলার-এর চাহিদা ও মূল্য বেড়ে যাবে। ফলে মার্কিন উৎপাদন-এর মূল্য বিশ্ব ও মার্কিন বাজারে আরও বেড়ে যাবে। ফলে মার্কিন উৎপাদনের চাহিদা কমে যাবে আর তাই মার্কিন উৎপাদনও কমে যাবে। তাই সব শেষে দেখা যাবে মার্কিন শুল্ক আরোপের ফলে উৎপাদন তো বাড়েইনি বরং কমে গেছে।

ট্রাম্প চাইবে মার্কিন বিলাসবহুল পণ্য পরিষেবা দরিদ্র দেশগুলো কিনে মার্কিন বাণিজ্য ঘাটতি কমাক। এইভাবে দরিদ্র দেশগুলোর ধনী শ্রেণি একদিকে বিলাসবহুল পণ্য ব্যবহার বাড়াবে আর অন্যদিকে সেই দেশের বৈদেশিক আয় কমবে যা সেখানে বৈদেশিক মুদ্রার অভাব তৈরি করে সমাজকেই অস্থিতিশীল করে তুলবে। তাই দরিদ্র দেশগুলোর উচিত মার্কিন বাজারে রপ্তানী করার ওপর নির্ভর না করা। বিকল্প বাজার খোঁজা এবং দেশের মধ্যে আভ্যন্তরীণ বাজার বৃদ্ধি কর। আভ্যন্তরীণ বাজার বৃদ্ধির জন্য পরিকাঠামোয় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার। শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বাড়াবার দিকে নজর দেওয়া দরকার। পৃথিবীতে বড়ো অর্থনীতি ও বাজার হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান। আরব উপকূল, তুর্কিয়ে, রাশিয়া, লাতিন আমেরিকা, ভারত ও দঃ পূঃ এশিয়া মাঝারি মাপের বাজার। চীনে আরও বাজার পেতে চীনা মুদ্রা ইউয়ান ব্যবহার বাড়ানো দরকার। চীন ২০২৫-এর মার্চ মাসেই ডিজিটাল ইউয়ান চালু করেছে যা দিয়ে দঃ পূঃ এশিয়া ও আরব উপকূল মাত্র ৩ সপ্তাহেই ১.২ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের লেনদেন করে ফেলেছে। ডলার ব্যাঙ্ক সুইফট মারফত এক একাউন্ট থেক আরেক একাউন্টে যেতে ৩ থেকে ৫ দিন লাগে। সেখানে ডিজিটাল ইউয়ান চলে যাচ্ছে মাত্র ৭ সেকণ্ডে। মার্কিন জিপিএস-এর চেয়ে অনেক বেশি উন্নত চীনা বেইদাউ নেভিগেশন ও কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক সম্মিলিত ডিজিটাল ইউয়ান ব্যবহার বাড়লে, ইউয়ান-এর মূল্য বাড়বে এবং এর ফলে চীনের বাজারে রপ্তানী করা সহজ হবে। তেমনই ইউরো ও জাপানী ইয়েন-এরও ব্যবহার বাড়িয়ে সেখানে বাজার বাড়ানো যেতে পারে। ট্রাম্প যেহেতু মার্কিন বাজার থেকে রপ্তানী মারফত আয় কমিয়েই দিচ্ছে, তাই ডলারের ব্যবহার কমালে স্যাঙ্কশন খেতে হবে, সেই ভয় অমূলক। দুর্বল অর্থনীতিগুলো সাময়িকভাবে মার্কিন আদেশ মেনে রপ্তানী শিল্প বাঁচাক কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে তাদের বিকল্প বাজার খুঁজতে হবে, বিকল্প মুদ্রা ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং দেশের ভেতরে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়িয়ে ও শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে আভ্যন্তরীন বাজার বাড়াতে হবে।

Author: Saikat Bhattacharya


You may also like



A PHP Error was encountered

Severity: Warning

Message: touch(): Unable to create file ci_session/ci_session3962018ed6071164f064b4216cce3f14872e67ae because No such file or directory

Filename: drivers/Session_files_driver.php

Line Number: 252

Backtrace:

A PHP Error was encountered

Severity: Warning

Message: session_write_close(): Failed to write session data using user defined save handler. (session.save_path: ci_session)

Filename: Unknown

Line Number: 0

Backtrace: