বঙ্গীয় বদ্বীপ, উত্তরভাগ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
বাংলাদেশে যখন পাকিস্তানবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন চলেছে, তারও আগে থেকে এইদিকে মার্কিনী গুপ্তগোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ'র ঘাঁটি ছিলো। সেই সময়ে ওরা পাকিস্তানকে সাহায্য করেছিল। ফলত, পূর্ব বাংলার মানুষদের জীবন নিয়ে টানাটানি, গণহত্যা।
গ্যারি ব্যাস-য়ের 'ব্লাড্ টেলিগ্রাম' গ্রন্থে যেটা জানা যায়:-
১৯৭১-এ বাংলাদেশের সেই ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করে ঢাকার মার্কিনী দূতাবাসের অধ্যক্ষ জনৈক আর্থার কেন্ট ব্লাড্ মার্কিন রাষ্ট্রপতি রিচার্ড নিক্সন এবং কূটনীতিবিদ হেনরি কিসিঞ্জারের উদ্দেশ্যে একটি টেলিগ্রাম বার্তা পাঠান হস্তক্ষেপ করবার জন্য।
কিন্তু, কিসিঞ্জার ও নিক্সন সেটা করতে রাজি হয়না যেহেতু তাদের উদ্দেশ্য ছিলো তৎকালীন পূর্ব-বাংলাকে ব্যবহার করে চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্কের পথ প্রশস্ত করা।
~~~
ভারতের সবথেকে পুরোনো মার্কিনী দূতাবাস কোলকাতাতেই স্থাপিত হয়। সেটা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে।
রাষ্ট্রপতি জিয়র্জ ওয়াশিংটন নিয়োগ করেন বেঞ্জামিন জয়-কে, যাকে কোলকাতার উদ্দেশ্যে পাঠানো হয় প্রথম মার্কিনী দূতাবাসের অধ্যক্ষ হিসেবে।
[যদিও বেঞ্জামিন জয়কে ব্রিটিশেরা তেমন পাত্তা দেয়নি। ১৮৩০-এর দশক থেকে ১৮৮০ পর্যন্ত আমেরিকা এই বাংলায় জাহাজে করে বরফ পাঠাত। বাংলা আর আমেরিকার মধ্যে বরফের ব্যবসা ছিলো সেইসময়। কোম্পানির উপনিবেশিক আমলে এর বেশি তাদের বাংলার সঙ্গে কাজকারবার ছিলোনা।
- তথ্যসূত্র Biswa Nanda মহাশয়]
তার আরো পর থেকে ভারতের বিভিন্ন ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাথা ঘামানো চালু হয়। এরা শুধু এপার বাংলাতেই নয়, গোটা পূর্ব ভারত এবং ঈশান ভারতের ক্ষেত্রে ক্রিয়াশীল।
~~~
প্রশ্ন হলো মার্কিনী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও'র আচমকা এপার বাংলায় আগমন কীসের জন্য?
একটা কারণ, ভেনিজুয়েলা থেকে তেল কেনার বোঝাপড়া পাকা করতে।
আরেকটা বড় কারণ, হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্রীয় আমেরিকা তেমন সুবিধে না করতে পারায় হলদিয়া-তাজপুর বন্দর হয়ে বঙ্গোপসাগরের জলপথ নিজের করায়ত্তে রাখার তীব্র আগ্রহ। যেহেতু, চীন মালাক্কা প্রণালীতে উপস্থিত রয়েছে।
চীন-মার্কিন দ্বন্দের দিকটি দ্রষ্টব্য এক্ষেত্রে।
বঙ্গোপসাগর বহুবছর ধরেই আমেরিকার জন্য লক্ষ্যবস্তু।
এর সাথেই সম্পর্কিত আরেকটি বড় কারণ:
বাংলাদেশের সাথে 'তিস্তা চুক্তি' বাস্তবায়িত করা।
ঢাকা চীনের সাথে মিলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা সফল করতে আগ্রহী হয়েছে যেহেতু দীর্ঘদিন ধরে ওপারে তিস্তার উপত্যকায় সাধারণ বাংলাদেশীদের জীবনও দুর্বিষহ হয়ে উঠছে এই পরিকল্পনার সঠিক দিশার অভাবে।
~~~
২০১২ সালে যখন মমতার ব্যানার্জীর সরকার ছিলো, তখন এপস্টেইন শ্রেণীর অন্যতম কুখ্যাত শিশুখাদক, শিশুকামী ও পিশাচিনী হিলারি ক্লিন্টন দেখা করতে আসে মমতাদেবীর সাথে এই 'তিস্তা চুক্তি'র জন্য।
অধ্যাপক, বৈজ্ঞানিক এবং বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী গর্গ চট্টোপাধ্যায়বাবুও তিস্তা চুক্তি'র জন্য উত্তরবঙ্গের ক্ষতির ব্যাপারে অনেক বছর আগে সাধারণ বাঙ্গালীদেরকে অবগত করেছিলেন। বাঙ্গালীরা কানে তোলেনি ওনার কথা।
['তিস্তা চুক্তি' হলো উত্তরবঙ্গকে শুকিয়ে সেখানকার কৃষি আর সেচ ব্যবস্থার বারোটা বাজিয়ে তিস্তা নদীর জল পুরোটাই বাংলাদেশকে দিয়ে দেওয়া, তাদের তিস্তা মহাপরিকল্পনার জন্য।]
কিন্তু, মমতা ব্যানার্জী সেই 'তিস্তা চুক্তি' সফল হতে দেননি। সেটা উনি আটকে দেন উত্তরবঙ্গকে শুকিয়ে যেতে দেবেননা বলে। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হয়ে নিজ রাজ্যের সমস্ত দিকের মানুষদের কল্যাণ ওনার কাছে প্রাধান্য পেয়েছিল তখন।
আর সেইজন্য হিলারি ক্লিন্টন মমতা ব্যানার্জীকে রাজি করাতে আসে, যাতে চুক্তিটা করা যায়। তার সাথে মার্কিনী খুচরোপণ্য পশ্চিমবঙ্গে ঢোকানোর উদ্দেশ্যটিও ছিলো।
মূল গন্তব্য ছিলো, চীন ও বাংলাদেশ।
অতএব, ভারতের অঙ্গরাজ্য পশ্চিমবাংলার নির্বাচনে জালিয়াতি এবং সাবোতাজের মাধ্যমে একটি সরকারের ক্ষমতা দখলের জন্য মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিনদন জানাতে আসে।
ভারতের "অভ্যন্তরীণ" নির্বাচনে পেন্টাগনের এই অধীর আগ্রহ, উল্লাস ও অভিবাদনে কারো কারো ভুরু কুঁচকায়না বা কারো মনে সন্দেহ জাগেনা।
তারপরেই এখন মার্কো রুবিওর ভারতের একটি অঙ্গরাজ্যের রাজধানী কোলকাতায় আসবার প্রাধান্য -- যেই কোলকাতার কিনা দিল্লী-মুম্বাই-বেঙ্গালুরু-আহমেদাবাদের মতন গুরুত্ব হবার কথা নয় কারণ "বাংলায় তো কিছুই নেই" বা "কোলকাতা তো বস্তির শহর" -- নির্দিষ্ট বার্তা বহন করে বৈকী!
~~~
আদানির নামে যাবতীয় মামলা নিয়ে আমেরিকা আপাতত বেশি কিছু করবেনা।
অন্যদিকে আদানি ইজরায়েলের পরমসখা। হাইফা বন্দরের বরাত পেয়েছিল, যদ্দূর মনে পড়ে।
আইমেক্ করিডরের জন্য কৌশলগত দিক দিয়ে হাইফা বন্দরের তাৎপর্য অনেক।
ওদিকে ইজরায়েল মানেই আমেরিকা। দুয়ে মিলে ইরানের বিপক্ষে যুদ্ধবাজ অক্ষ।
আদানি আবার শাসকদলের ইয়ে, মানে, সখা পুঁজিপতি। ক্রোনি ক্যাপিটালিস্ট।
দক্ষিণবঙ্গের তাজপুর বন্দর আদানিকে দেওয়া নিয়ে কয়েকবছরের চব্য চলছিলো।
দুইয়ে দুইয়ে চার, চারে চারে আট, আটে আটে ষোলো, ষোলো ষোলোয় বত্রিশ..... এক হাজার চব্বিশ -- এভাবেই মিলতে থাকে।
~~~
এবারের গেলো নির্বাচনে মার্কিনী ডীপস্টেটের (পেন্টাগন ও সিআইএ সহ) ভূমিকা অনস্বীকার্য। দিনের আলোর ন্যায় স্পষ্ট।
কিন্তু, হোয়াটস্যাপ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচারকল্প (প্রোপাগান্ডা) অনুযায়ী যেই ভাষ্য বাজারে ছাড়া হয়েছে, সেটা ঠিক উল্টো --
"এই তৃণমূল সরকার আমেরিকার ডীপস্টেট দ্বারা পরিচালিত ছিলো। হিলারি ক্লিন্টন মমতার সাথে দেখা করে গিয়েছিল কি এমনি?! বিজেপি এসে আমেরিকার ডীপস্টেট এবং সিআইএ-কে জোরে ধাক্কা দিয়েছে। মাস্টারস্ট্রোক!!"
এটা অনেকটা সাধুর বেশে এক চোরের চিৎকার, "ওই দ্যাখো! চোর পালিয়েছে! ধর ধর শালাকে!"
বাঙ্গালীদের জন্য আগামীদিন উদ্বেগজনক। তবে দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই।
সজাগ থাকতে হবে, সচেতন হতে হবে, মূলধারার সংবাদমাধ্যম এবং বিনোদনের বাইরে বিচরণ বাড়াতে হবে। জোট বেঁধে ঐক্যবদ্ধ হতে লাগবে।
নিকট ভবিষ্যৎ টালমাটাল হলেও সুদূর ভবিষ্যৎ আত্মনিয়ন্ত্রণ, নিশ্চিন্তি, সমৃদ্ধি ও উত্তরণের দিকেই ধাবমান। অনুসন্ধান অনুযায়ী প্রতীতি অন্তত তেমনই।
~~~
এইসব মর্মেই সুজয় সরকারের বিশেষ আলোকপাত:-
"আসল উদ্দেশ্য তিস্তা চুক্তি করতেই হবে ঢাকার সাথে।
কারণ, উত্তরের জেলার সেচ কার্য সমেত কৃষিকাজের মাধ্যম তিস্তা নদীর জল। জল দিলে উত্তরের জেলা স্বাভাবিকভাবেই শুকিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা।
এতদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার থাকলে তিস্তা চুক্তিটা সম্ভব ছিল না। ওদিকে অপেক্ষা না করে তারেকের সরকার এক পা বাড়িয়েই রয়েছে চীনের দিকে তিস্তা চুক্তির জন্য।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বিএনপি জোট বাস্তবায়ন করলে বাঁধ নির্মাণের আড়ালে চাইনিজ স্পাই সহ বাদবাকিরা বেঙ্গল ডেল্টায় আসতো, সেটা পেন্টাগন কোনোভাবেই চাইতোনা।
সেজন্যই তো যেনতেনভাবে দখল করার উদ্দেশ্য নিয়ে ট্রাম্প দ্বারা ইরানের পাঁচগুণ বেশি বাহিনী বাংলায় মোতায়েন করা হয়েছিল এবং তাতে পেন্টাগনের মদতও ছিল। পেন্টাগন জানে যে, লক্ষাধিক বৈধ ভোটারদের শয়তানিভাবে বাদ দিয়ে নির্বাচন করে জিতেছে বিজেপি। সেই উদ্দেশ্য সফল। তাই ট্রাম্প মোদীকে বঙ্গ বিজয়ের পর শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন।
রুবিও কলকাতা সফরে আসছেন শুভেন্দুকে চাপ সৃষ্টি করতে দ্রুত ঢাকার সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন করতে। তাই বাংলা আগামীতে অ্যাংলো-স্যাক্সন ও হান-চাইনিজদের জাঁতাকলে পিষে এক ভয়ঙ্কর পরিকল্পনার ফাঁদে পড়তে চলেছে।"
Author: Aniket Mitra