Shafin Rahman
বাংলাদেশ চীনা যুদ্ধবিমান পাবে কিনা, কখন পাবে কিংবা চীন-মায়ানমার-বাংলাদেশ করিডোর কতটুকু বাস্তবসম্মত হয়ে উঠবে— এ সবকিছুই নির্ভর করছে দুটো বিষয়ের উপর।
১. চীন তাইওয়ানের ব্যাপারে কতটা সিরিয়াস
২. বাংলাদেশ ভারত এবং জাপানকে এমন কোনো কৌশলগত স্থানে এক্সেস দিচ্ছে কিনা যা চীনা স্বার্থের পরিপন্থী।
চীন যদি তাইওয়ানের ব্যাপারে কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করে থাকে, তাহলে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রথম বাধা এই অঞ্চলে ভারত এবং জাপান। কারণ তাইওয়নকে কেন্দ্র করে চীনা কার্যক্রম শুরু হলে সর্বপ্রথম শ্যাডো বা কাভার্ট রেসিস্ট্যন্স গড়ে তুলবে জাপান, আর সেই রেসিস্ট্যন্সের এক্সিকিউশন হবে ভারতের মাধ্যমে।
জাপান বর্তমানে তাদের ইন্ডিজেনাস টেকনোলজিতে বেশকিছু সফিস্টিকেটেড ওয়েপন তৈরী করতে শুরু করেছে। যেগুলি তারা ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইনে রপ্তানিও করতে চায়। তাই চীনের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে জাপানের ভৌগলিক সীমারেখার বাইরে তাদের মার্কিন নের্তৃত্বাধীন স্বার্থকে সীমাবদ্ধ করা এবং ভারতকে তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলা।
এই অঞ্চলে মার্কিন কৌশলটি ছিল: চীনকে একাধিক দিকে মনোযোগ ভাগ করতে বাধ্য করা। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে উলটো ভারতই হয়তো মনোযোগ বিভক্ত করতে বাধ্য হবে। উত্তরে চীন, পশ্চিমে পাকিস্তান এবং পূর্বে বাংলাদেশ— ভারতের মনোযোগ কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করে দিতে সক্ষম হয়েছে। ভারতের নীতি, কৌশল, সামরিক সক্ষমতা এখন আর একীভূত নয়।
এদিকে সর্বশেষ ইন্দো প্যাসিফিক কমান্ড এর নাম পুনরায় ‘ইউএস প্যাসিফিক কমান্ড'-এ শিফট হওয়ার ফলে ভারত ২০১৮ সাল থেকে এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত আঞ্চলিক বন্ধু হওয়ার যে সুনাম ও গুরুত্ব কুড়িয়েছিল— তা মুহূর্তেই উবে গেছে। এই ঘটনা ভারতের সক্ষমতাকে বিভক্ত করার চীনা পরিকল্পনার পালে বরং জোর হাওয়া দিয়েছে।
ইন্দো প্যাসিফিক কমান্ড থাকাকালীন এর এরিয়া অফ রেসপনসেবলিটি যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূল থেকে শুরু করে একেবারে ভারতের পশ্চিম সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। কিন্তু এখন 'ইন্দো' শব্দটি বাদ পড়ে যাওয়ায় এরিয়া অফ রেসপনসেবলিটিও সংকুচিত হয়ে এসেছে।
ভারত যতক্ষণ এই কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ছিল, ততক্ষণ যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক কমান্ডের বিস্তার সাউথ এশিয়া জুড়ে ছিল। কিন্তু এখন এটা শুধুমাত্র সাউথইস্ট এবং ইস্ট এশিয়া কেন্দ্রিক হয়ে গেছে। যার সবচেয়ে সাম্প্রতিক ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো ফিলিপাইন।
সম্প্রতি দক্ষিণ চীন সাগর বিষয়ক চীনা থিঙ্ক ট্যাঙ্ক “সাউথ চায়না সি স্ট্র্যাটেজিক সিচুয়েশন প্রোবিং ইনিশিয়েটিভ”— (SCSPI) জানাচ্ছে: যুক্তরাষ্ট্র Enhanced Defense Cooperation Agreement (EDCA) এর আওতায় ফিলিপাইনে নতুনভাবে আরো চারটি সামরিক ঘাটি বৃদ্ধি করেছে, যা দক্ষিণ চীন সাগরের আটটি সরু প্রণালির একটি ‘লুজান প্রণালী’র বেশ নিকটবর্তী। এই লুজন প্রণালীই আবার ফিলিপাইন এবং তাইওয়ানকে যুক্ত করেছে। অর্থাৎ বৃদ্ধিকৃত চারটি সামরিক ঘাটি এখন তাইওয়ানকে রক্ষায় ‘ফরোয়ার্ড বেস' হিসেবে কাজ করবে।
এর আগে ২০১৪ সালে EDCA অনুসারে যুক্তরাষ্ট্রকে ফিলিপাইনের পাঁচটি সামরিক ঘাটিতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এইগুলি হলো: পাম্পাঙ্গার বাসা এয়ারবেস, নুয়েভা এসিজার ফোর্ট এয়ারবেস, ম্যাগসাইসাই এয়ারবেস, পালাওয়ানের আন্তোনিও বাউতিস্তা এয়ারবেস, সেবুর মাকতান-বেনিতো এবুয়েন এয়ারবেস এবং কাগায়ান দে ওরোর লুম্বিয়া এয়ারবেস।
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ফিলিপাইন এই পরিকল্পনা ঘোষণা করে যে, মার্কিন বাহিনী দ্বারা বিনিয়োগকৃত ও স্থাপিত পূর্বের পাচটি ঘাটির পাশাপাশি তারা আরও চারটি নতুন ঘাটি স্থাপন করবে। এপ্রিলে ফিলিপাইন এই চারটি অতিরিক্ত ঘাটির অবস্থান ঘোষণা করে। সেগুলি হলো: কাগায়ানের ক্যামিলো ওসিয়াস নেভাল বেস ও লাল-লো এয়ারপোর্ট, ইসাবেলার ক্যাম্প মেলচর দেলা ক্রুজ এবং পালাওয়ানের বালাবাক আইসল্যান্ড।
সম্প্রতি সেই ঘাটিগুলির কাজ শেষ হয়েছে এবং ঘাটিগুলিতে অস্ত্র মজুদের কাজও শুরু হয়েছে। যেমন: হিমার্স (HIMARS), টাইফুন (Typhon) এবং এনএমইএসআইএস (NMESIS) ইন্টারসেপ্টরের মতো মিসাইল সিস্টেমগুলি একের পর এক এসে পৌছাচ্ছে এবং বলা হচ্ছে যে ফিলিপাইনে মার্কিন উপস্থিতি এখন একটি স্থায়ী সামরিক উপস্থিতির সমতুল্য।
সুতরাং আমরা বুঝতে পারছি যে, ভারতের হাত ধরে এই অঞ্চলে চীনকে প্রতিরোধের স্বপ্ন আর দেখছেনা যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি ভারতকে এখন আর Trustworthy Strategic Partner'ও ভাবছেনা। যুক্তরাষ্ট্র তার মিলিটারি অ্যাসেট সম্পূর্ণ পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া কেন্দ্রিক করে ফেলতে শুরু করেছে। এমনকি ভারতের অংশীদারত্বে কোয়াড নামক কৌশলগত সংগঠনটিও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
আর অন্যদিকে চীন জোটনিরপেক্ষ বাংলাদেশকে একটা টোপ দিয়ে বলতে চাচ্ছে 'Either you have to be one hundred percent with us, or one hundred percent against us. There is no gray zone’
বাংলাদেশ যদি চীনা স্বার্থের জায়গাগুলিতে ভারত এবং জাপানকে এক্সেস না দেয়, দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করে— তবে চীন থেকে অনেক কিছুই বের করা আনা সম্ভব হবে।
Author: