ওয়াশিংটন পোস্ট ৬ মে ২০২৬ তারিখে যে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে, সেটি পড়লে একটা বিষয় খুব পরিষ্কার হয়ে যায়। ইরান ও আমেরিকার এই যুদ্ধকে শুধু কে কতগুলো মিসাইল ছুড়েছে, সেই হিসাব দিয়ে বোঝা যাবে না। আসল যুদ্ধটা হচ্ছে কে কতটা ক্ষতি লুকিয়ে রাখতে পারছে, আর কে স্যাটেলাইট ছবির মাধ্যমে সেই ক্ষতি পৃথিবীর সামনে তুলে ধরতে পারছে।
ওয়াশিংটন পোস্ট ১৫টি মার্কিন সামরিক স্থাপনার ওপর স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে দেখেছে, যুদ্ধ শুরুর পর ইরানের হামলায় অন্তত ২১৭টি স্থাপনা এবং ১১টি সামরিক সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। অর্থাৎ মোট ২২৮টি স্থাপনা ও সামরিক সম্পদ। এর মধ্যে ছিল হ্যাঙ্গার, ব্যারাক, জ্বালানি ডিপো, বিমান, রাডার, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং air defense equipment (বিমান প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম)। এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে যতটা স্বীকার করেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি। ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, সাতজন মার্কিন সেনা নিহত এবং চারশোর বেশি সেনা আহত হয়েছিল সেই সময় পর্যন্ত।
কিন্তু এখানেই গল্প শেষ নয়।
কারণ এই ১৫টি ঘাঁটি কোনো সাধারণ সামরিক স্থাপনা নয়। এর মধ্যে ছিল বাহরাইনের Naval Support Activity, যেখানে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর, কুয়েতের Camp Arifjan ও Ali Al Salem Air Base, কাতারের Al Udeid Air Base, সৌদি আরবের Prince Sultan Air Base এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির আরও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
অর্থাৎ ইরানের হামলা যদি সত্যিই এই ঘাঁটিগুলোর এতগুলো স্থাপনা ও সরঞ্জামকে আঘাত করে থাকে, তাহলে এটি শুধু কয়েকটি ভবন ধ্বংসের ঘটনা নয়। এটি আমেরিকার পুরো regional military infrastructure (আঞ্চলিক সামরিক অবকাঠামো)-এর ওপর সরাসরি আঘাত।
আর এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি সামনে আসে।
ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শুধু বাহরাইনের একটি ঘাঁটিতেই মোট ক্ষয়ক্ষতির অর্ধেকের বেশি হয়েছে। সেখানে Patriot ও THAAD air-defense systems, E-3 Sentry command-and-control aircraft, ব্যারাক, হ্যাঙ্গার, জ্বালানি ডিপো এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষতির কথা উঠে এসেছে।
এখন আপনি একটু চিন্তা করুন।
যে আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক দশক ধরে বিশাল সামরিক নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে, সেই নেটওয়ার্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিগুলোতেই যদি ইরানের মিসাইল ও ড্রোন পৌঁছে যায়, তাহলে প্রশ্নটা আর শুধু ইরানের missile capability (মিসাইল সক্ষমতা) নিয়ে থাকে না।
প্রশ্নটা হয়ে যায়, আমেরিকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আসলে কতটা কার্যকর?
এই প্রশ্নের উত্তর আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন দেখা যায়, ওয়াশিংটন পোস্টের সঙ্গে কথা বলা CSIS-এর সিনিয়র উপদেষ্টা ও সাবেক মেরিন কর্নেল Mark Cancian বলেছেন,
“The Iranian attacks were precise. There are no random craters indicating misses.”
(দ্য ইরানিয়ান অ্যাটাকস ওয়ার প্রিসাইস। দেয়ার আর নো র্যান্ডম ক্রেটার্স ইন্ডিকেটিং মিসেস।)
অর্থাৎ,
“ইরানের হামলাগুলো ছিল সুনির্দিষ্ট। এমন কোনো এলোমেলো বিস্ফোরণের চিহ্ন নেই, যা দেখে মনে হবে মিসাইলগুলো লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে।”
এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য।
কারণ এর অর্থ হচ্ছে, ইরান শুধু অনেক মিসাইল ছুড়েছে তা নয়। অন্তত কিছু ক্ষেত্রে তারা কোথায় আঘাত করতে চায়, সেটাও জানত।
আর এই জায়গাতেই আসে স্যাটেলাইট ছবির বিষয়টি।
ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, যুদ্ধ চলাকালীন Vantor এবং Planet-এর মতো commercial satellite imagery (বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট ছবি) সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে মধ্যপ্রাচ্যের ছবি প্রকাশে সীমাবদ্ধতা, বিলম্ব বা withholding (প্রকাশ না করার) ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হয়েছিল। ফলে যুদ্ধ চলাকালীন প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে।
কিন্তু ইরান-সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলো নিয়মিত উচ্চ রেজোলিউশনের স্যাটেলাইট ছবি প্রকাশ করতে থাকে।
ওয়াশিংটন পোস্ট সেই ছবিগুলোর মধ্যে শতাধিক ছবি বিশ্লেষণ করে। ১০৯টি ছবির সত্যতা ইউরোপীয় ইউনিয়নের Copernicus satellite imagery এবং যেখানে সম্ভব Planet-এর উচ্চ রেজোলিউশনের ছবির সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পর্যালোচনা করা ইরানি ছবিগুলোর মধ্যে কোনো manipulation (কারচুপি) পাওয়া যায়নি। বরং Planet-এর আলাদা imagery বিশ্লেষণ করে আরও ১০টি ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়া স্থাপনার সন্ধান পাওয়া যায়, যেগুলো ইরানি প্রকাশিত ছবিতে ছিল না।
অর্থাৎ,
যে ক্ষয়ক্ষতির কথা ইরান বলছিল, তার সবটাই যে সত্য—এমন নয়।
কিন্তু যেটুকু তারা দেখিয়েছিল, তার বড় একটি অংশ স্বাধীন স্যাটেলাইট বিশ্লেষণের মাধ্যমে সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে।
এই জায়গাটাই আসলে যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
আগে যুদ্ধের সময় একটি দেশ বলত, “আমরা জিতছি।”
অন্য দেশ বলত, “না, আমরা জিতছি।”
কিন্তু এখন স্যাটেলাইট ছবি এসে মাঝখানে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে।
মিসাইল কোথায় পড়েছে, কোন রানওয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কোন হ্যাঙ্গার ধ্বংস হয়েছে, কোন বিমান আর দাঁড়িয়ে নেই, এসব অনেক সময় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মহাকাশ থেকে দেখা যায়।
এ কারণেই Washington Post-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই হামলাগুলো আমেরিকাকে নতুন একটি trade-off (কঠিন সিদ্ধান্ত)-এর সামনে দাঁড় করিয়েছে।
সৈন্যদের নিরাপদ রাখতে হলে তাদের ঘাঁটি থেকে সরিয়ে নিতে হবে।
আর যদি ঘাঁটিতে রাখতে হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ হামলার ঝুঁকি মেনে নিতে হবে।
Stimson Center-এর ফেলো এবং সাবেক Air Force কর্মকর্তা Maximilian Bremer বলেছেন,
“We have moved from an age of stealth to one where the entire battlespace is translucent and increasingly transparent.”
(উই হ্যাভ মুভড ফ্রম অ্যান এইজ অফ স্টেলথ টু ওয়ান হোয়্যার দ্য এনটায়ার ব্যাটলস্পেস ইজ ট্রান্সলুসেন্ট অ্যান্ড ইনক্রিজিংলি ট্রান্সপারেন্ট।)
অর্থাৎ,
“আমরা এমন এক যুগ থেকে বেরিয়ে এসেছি যেখানে যুদ্ধক্ষেত্র গোপন রাখা যেত। এখন পুরো যুদ্ধক্ষেত্র ক্রমেই স্বচ্ছ এবং দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।”
এরপর তিনি আরও বলেছেন,
“It feels like we should be on offense, but we are definitely playing defense around these bases.”
(ইট ফিলস লাইক উই শুড বি অন অফেন্স, বাট উই আর ডেফিনিটলি প্লেয়িং ডিফেন্স অ্যারাউন্ড দিজ বেইসেস।)
অর্থাৎ,
“আমাদের মনে হতে পারে আমরা আক্রমণ করছি। কিন্তু এই ঘাঁটিগুলোর চারপাশে বাস্তবে আমরাই প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে আছি।”
আমার কাছে এই কথাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ আমেরিকা হয়তো ইরানের ভেতরে আকাশপথে আক্রমণ চালাতে পারছে।
কিন্তু একই সময়ে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার সামরিক ঘাঁটিগুলোকে এমনভাবে চাপের মধ্যে ফেলছে যে, আমেরিকাকে এখন নিজের ঘাঁটি, সৈন্য, বিমান, রাডার এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কীভাবে বাঁচিয়ে রাখা যায়, সেটাও ভাবতে হচ্ছে।
অর্থাৎ যুদ্ধের মানচিত্র বদলে যাচ্ছে।
আর যদি Washington Post-এর এই বিশ্লেষণ সঠিক হয়, তাহলে এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, ইরানকে শুধু তার নিজের ভূখণ্ডে আঘাত করলেই তার সামরিক সক্ষমতা শেষ হয়ে যাবে, এই ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে মিলছে না।
কারণ ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো তার মিসাইলের সংখ্যা নয়।
তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, সে আমেরিকার বিশাল সামরিক অবকাঠামোর দুর্বল জায়গাগুলো খুঁজে বের করে সেখানে আঘাত করার সক্ষমতা দেখিয়েছে।
আর এখন সেই ক্ষয়ক্ষতি স্যাটেলাইট ছবিতে ধরা পড়ছে।
এই যুদ্ধের শেষ যখনই হোক, একটি বিষয় এর মধ্যেই পরিষ্কার।
আমেরিকা ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে যতটা সহজ মনে করেছিল, বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্র হয়তো তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।
কারণ আকাশে মিসাইলের যুদ্ধ এক জিনিস।
কিন্তু একটি দেশের পুরো সামরিক নেটওয়ার্ককে বারবার নিরাপদ রাখার যুদ্ধ সম্পূর্ণ অন্য জিনিস।
আর সেই যুদ্ধে ইরান যে আমেরিকাকে অন্তত কঠিন পরীক্ষার মধ্যে ফেলেছে, সেটা এখন আর শুধু তেহরানের দাবি নয়।
Washington Post-এর স্যাটেলাইট ছবিও সেই গল্পের একটা অংশ দেখিয়ে দিচ্ছে।
Researcher | Geopolitical Affairs | Entrepreneur | Founder
Academic Background:
Royal Roads University (RRU), Canada
Umeå University, Sweden
Author: Saikat Bhattacharya