Info Bangla
বাংলাদেশের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মমুখী প্রশিক্ষণে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা আরও বড় পরিসরে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ও চীন ‘চীন-বাংলাদেশ ভোকেশনাল এডুকেশন, ট্রেনিং অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার’ প্রতিষ্ঠার জন্য একটি নতুন সমঝোতা করেছে।
এই উদ্যোগটি শুধু একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, আধুনিক কারিগরি শিক্ষা, গবেষণা, শিল্পভিত্তিক ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ, পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, চীনা ভাষা শিক্ষা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময় এবং কর্মসংস্থানমুখী দক্ষতা তৈরির মতো একাধিক বিষয়।
চীনের জিয়াংসি প্রদেশে অনুষ্ঠিত ‘চীন-বাংলাদেশ শিক্ষা বিনিময় সম্মেলনে’ এই সমঝোতা স্বাক্ষর করা হয়। বাংলাদেশের পক্ষে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. দাউদ মিয়া এবং চীনের পক্ষে জিয়াংসি সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি নরমাল ইউনিভার্সিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ঝেং পেংউ এতে স্বাক্ষর করেন।
সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহ্দী আমিনসহ বাংলাদেশ ও চীনের শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং শিল্প খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে?
এই সহযোগিতার অন্যতম লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের তরুণদের শুধু একাডেমিক শিক্ষা দেওয়ার পরিবর্তে বাস্তব কর্মক্ষেতরের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ করে তোলা।
সমঝোতার আওতায় যেসব ক্ষেত্রে সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে:
আধুনিক ভোকেশনাল ও কারিগরি প্রশিক্ষণ
কারিগরি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি
আধুনিক ও কর্মমুখী পাঠ্যক্রম তৈরি
দ্বিভাষিক শিক্ষা উপকরণ ও শিক্ষাসামগ্রী
যৌথ গবেষণা ও গবেষণা কেন্দ্র
শিক্ষক ও শিক্ষার্থী বিনিময়
চীনে শিক্ষা সফর ও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ
বাংলাদেশে শিল্পভিত্তিক ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ
চীনা বিনিয়োগে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রশিক্ষণ সহযোগিতা
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পখাতের মধ্যে সরাসরি সংযোগ
যৌথ সার্টিফিকেশন এবং ভবিষ্যতে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ নেটওয়ার্ক তৈরির উদ্যোগ।
অর্থাৎ, একজন শিক্ষার্থী কারিগরি শিক্ষা শেষ করার পর তার শেখা বিষয়টি বাস্তবে কোথায় এবং কীভাবে কাজে লাগবে, সেই বিষয়টির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
একসঙ্গে চালু হয়েছে ৩টি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম
এই সহযোগিতার আরও একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, একই অনুষ্ঠানে তিনটি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নভিত্তিক সহযোগিতা প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়েছে।
১. চীন-বাংলাদেশ ভোকেশনাল টিচার ট্রেনিং সেন্টার
কারিগরি শিক্ষকদের আধুনিক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য এই কেন্দ্র কাজ করবে। ফলে শিক্ষকরা নতুন প্রযুক্তি, আধুনিক প্রশিক্ষণ পদ্ধতি এবং শিল্পের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে নিজেদের দক্ষতা আরও সামঞ্জস্য করার সুযোগ পেতে পারেন।
২. বাংলাদেশ ভোকেশনাল এডুকেশন রিসার্চ সেন্টার
কারিগরি শিক্ষা নিয়ে গবেষণা, পাঠ্যক্রম উন্নয়ন এবং দক্ষতা উন্নয়নের নতুন মডেল তৈরিতে এই কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
৩. বাংলাদেশ ‘চাইনিজ ল্যাঙ্গুয়েজ + স্কিল ডেভেলপমেন্ট’ কোঅপারেশন সেন্টার
চীনা ভাষা শিক্ষা এবং কারিগরি দক্ষতাকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার জন্য এই প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে চীনের সঙ্গে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও শিল্পভিত্তিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে ভাষাগত দক্ষতাও একটি বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।
শুধু প্রচলিত কারিগরি শিক্ষা নয়, গুরুত্ব পাচ্ছে নতুন প্রযুক্তিও
সম্প্রতি চীনের গুয়াংডংয়ে অনুষ্ঠিত আরেকটি সিম্পোজিয়ামে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বাংলাদেশের শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাতের কথা তুলে ধরেছেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বকে টেকসই করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), রোবোটিক্স, ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স, সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট এবং ফিনান্সিয়াল টেকনোলজির মতো উদীয়মান প্রযুক্তি খাতে বিশ্বমানের দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা জরুরি।
এখানেই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কারণ, ভবিষ্যতের চাকরির বাজার শুধু প্রচলিত দক্ষতার ওপর নির্ভর করবে না। প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন ধরনের দক্ষতাও প্রয়োজন হবে। বাংলাদেশ-চীন শিক্ষা সহযোগিতার মাধ্যমে এসব উদীয়মান ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা তৈরির সুযোগ বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
মাহ্দী আমিন চীনের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় আধুনিক কারিগরি পাঠ্যক্রম, যৌথ সার্টিফিকেশন এবং এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।
চীনা ভাষার ওপরও কেন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে?
বাংলাদেশ ও চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক যত বাড়ছে, দুই দেশের ব্যবসা, শিল্প, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের যোগাযোগও তত বাড়ছে।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশি তরুণদের জন্য কারিগরি দক্ষতার পাশাপাশি ম্যান্ডারিন বা চীনা ভাষা শেখার সুযোগ তৈরি করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
গুয়াংডংয়ের আলোচনায় মাহ্দী আমিন বলেন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশি তরুণদের এগিয়ে নিতে ম্যান্ডারিন চর্চাকে অগ্রাধিকার দিয়ে তৃতীয় ভাষা শিক্ষা চালুর কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, ভবিষ্যতে একজন তরুণের কাছে শুধু একটি কারিগরি দক্ষতা থাকাই নয়, আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সক্ষমতাও তার বাড়তি শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশে শিল্পের সঙ্গে প্রশিক্ষণের সংযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা
এই উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পখাতের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি করা।
বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা প্রশিক্ষণের সময়ই বাস্তব শিল্প পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
কারিগরি শিক্ষাকে কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে এই ধরনের শিল্প-শিক্ষা সংযোগ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনও জোর দিয়েছেন, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে অবশ্যই শিল্প ও কর্মসংস্থান বাজারের প্রকৃত চাহিদার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করতে হবে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীরা যেন কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের আগেই একাডেমিক জ্ঞানের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন করতে পারে, সেই সুযোগ তৈরি করা জরুরি।
চীনের ১৯টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে
জিয়াংসি প্রদেশের সম্মেলনে চীনের ১৯টি বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি প্রতিষ্ঠান ও শিল্পখাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ছিল জিয়াংসি সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি নরমাল ইউনিভার্সিটি, নানচাং ইউনিভার্সিটি, ইস্ট চায়না জিয়াওটং ইউনিভার্সিটি, নানচাং হংকং ইউনিভার্সিটি, জিয়াংসি ভোকেশনাল ইউনিভার্সিটি অব ফরেন স্টাডিজ, জিউজিয়াং ভোকেশনাল ইউনিভার্সিটি, জিয়াংসি ইন্ডাস্ট্রি পলিটেকনিক কলেজ, জিয়াংসি ভোকেশনাল টেকনিক্যাল কলেজ অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড ট্রেডসহ আরও বেশ কয়েকটি শিক্ষা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠান।
অন্যদিকে, গুয়াংডংয়ে অনুষ্ঠিত সিম্পোজিয়ামেও চীনের ১১টি শীর্ষ কারিগরি ও প্রযুক্তিগত কলেজ অংশ নেয়। সেখানে কারিগরি শিক্ষা, ভাষা শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিল্প-শিক্ষার সমন্বয় নিয়ে আলোচনা হয়।
এ সময় বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা উপদেষ্টা ‘বেইডৌ+’ ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন ল্যাবরেটরি পরিদর্শন করেন এবং রোবোটিক্স, রোবট ডগের প্রোগ্রামিংসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন।
বাংলাদেশের তরুণদের জন্য এর অর্থ কী?
সবচেয়ে সহজভাবে বললে, এই উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের তরুণদের জন্য আরও আধুনিক কারিগরি শিক্ষা, উন্নত প্রশিক্ষণ, ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের উপযোগী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ বাড়তে পারে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি: এই সমঝোতাকে সরাসরি চীনে চাকরি বা কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
বরং এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে এমন একটি দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা, যারা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহ্দী আমিনের বক্তব্যেও বিষয়টি স্পষ্ট। তার ভাষায়, লক্ষ্য হচ্ছে শিক্ষাকে দক্ষতায়, দক্ষতাকে কর্মসংস্থানে এবং কর্মসংস্থানকে অর্থনৈতিক সুযোগে পরিণত করা।
এ কারণেই বাংলাদেশ-চীন এই নতুন সহযোগিতাকে শুধু একটি চুক্তি হিসেবে না দেখে কারিগরি শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিল্পের সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ আরও শক্তিশালী করার একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যদি পরিকল্পনাগুলো বাস্তবে কার্যকর করা যায়, তাহলে বাংলাদেশের তরুণদের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি, শিল্পভিত্তিক প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা এবং ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের বাজারে নিজেদের প্রস্তুত করার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
Author: Saikat Bhattacharya