অমিত শাহ ও নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি আসলে বানিয়া (মূলত গুজরাটি মাড়োয়ারি) ও ওবিসি (মূলত জোতদার বা গ্রামীণ ধনী শ্রেনী) দের দল, ঠিক দলিতদের নয়। ক্রমেই ধনী দলিতরা এদের সাথে পুঁজির স্বার্থেই যুক্ত হয়েছে।
তবে বানিয়া ওবিসি শক্তি ভারতের পুঁজির উৎস এবং তারা উচ্চ বর্ণের বিরুদ্ধে।
কিছু উচ্চ বর্ণ এদের চাকর হিসেবে কাজ করে মাত্র।
তৃণমূল সিপিএম কংগ্রেস হল আসল উচ্চ বর্ণদের দল যারা প্রাক পুঁজিবাদী সমাজগুলোর (দলিত, আদিবাসী, মুসলমা্ন, গরিব ওবিসি বানিয়ারাও) সাথে পুঁজিপতি বানিয়া ওবিসিদের একটা সমঝোতা করিয়ে দিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করে।
শাহ মোদীর বিজেপি প্রাক পুঁজিবাদী সমাজগুলোকে বলপূর্বক গিলতে চায়। উচ্চ বর্ণের মধ্যস্থতা চায়না। এর একটা বড় কারণ নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময় ভারত জুড়ে এমনকি কেন্দ্রের ইউপিএ সরকারের উচ্চ বর্ণ নেতৃত্ব কৃষি সমাজ উচ্ছেদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।
আরেকটা কারণ হল এই বাণিয়া ওবিসি (জোতদার) পুঁজিপতিরা সস্তায় জমি দখল ও সস্তা শ্রমশক্তি কিনে বিশ্ব বাজারে প্রতিযোগিতা করার কথা ভাবে। বাংলাদেশীর নামে বাঙালি মুসলমান উচ্ছেদ বা মাওবাদী ট্যাগ মেরে আদিবাসী উচ্ছেদ সবই সস্তা জমি পাওয়ার লোভে।
তবে আধুনিক যুগে বিশ্ব বাজারে টিকে থাকতে গেলে সবার আগে দরকার শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি যা সম্ভব কেবল শ্রমিকের শিক্ষা ও ট্রেনিং-এ বিনিয়োগ করে। শ্রমিকের মজুরি বাড়তে থাকলে লাগাতার স্বয়ংক্রিয় করে তুলতে হবে উৎপাদন ব্যবস্থাকে। এর জন্য দরকার গবেষণায় বিনিয়োগ। এছাড়াও শক্তির খরচ, যাতায়াত খরচ ও মাল স্টোরেজের খরচ কমিয়েই কেবল বিশ্ব বাজারে প্রতিযোগিতা করা সম্ভব। এর জন্য দরকার পরিকাঠামোতে বিপুল বিনিয়োগ।
বল পূর্বক জমি দখল করে সস্তা জমি আর শ্রমিক পাওয়া যায় বটে কিন্তু আধুনিক যুগে শ্রমিকের উৎপাদনশীলতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমিকের মজুরি কম কিন্তু শ্রমিক জমি হারানো হতদরিদ্র বলে তার উৎপাদনশীলতাও কম এমন দেশ আজ বিশ্ব বাজারে একেবারেই অচল।
ষোড়শ শতক থেকে উনবিংশ শতকের মধ্য ভাগ পর্যন্ত কৃষকের জমি হাতিয়ে সস্তায় জমি দখল করার কায়দা আর কৃষককে সস্তায় শ্রম শক্তি বিক্রি করতে বাধ্য করার কায়দা বেশ জনপ্রিয় ছিল পুঁজিবাদী বিশ্বে। কিন্তু ক্রমেই পুঁজিপতিরা বুঝতে থাকে শ্রমিককে উৎপাদনশীল করে তুলতে পারলেই কেবল মুনাফা বিপুলভাবে বাড়ানো সম্ভব। তাই শ্রমিককে হত দরিদ্র রেখে নয়, শ্রমিকের শিক্ষা স্বাস্থ্য ট্রেনিং-এ শুরু হল বিনিয়োগ। এটা শুরু হয় ১৮৭০ থেকে অর্থাৎ দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবের সময় থেকে।
তবে শ্রমিকের পেছনে বিনিয়োগ চরম পর্যায়ে উঠল সোভিয়েত ইউনিয়নের অবিশ্বাস্য গতির শিল্পায়ণ পৃথিবীর সামনে আসার পরে। সোভিয়েতের ভূমি সংস্কার করে গরীব কৃষকের দারিদ্র্য কমিয়ে, তাকে বিনা মূল্যের শিক্ষা স্বাস্থ্য ট্রেনিং দিয়ে যে সবচেয়ে গতিশীল শিল্পায়ণ পাওয়া সম্ভব তা পুঁজিবাদী পশ্চিমও স্বীকার করে নেয়। তাই মার্কিন সরকার নিজেই ভূমি সংস্কার করায় তাইওয়ানে, দক্ষিণ কোরিয়াতে। ব্রিটিশ সরকার মালেয়শিয়াতে ভূমি সংস্কার কর্মসূচী চালায়। মিশর ইরাক সিরিয়া জুড়ে জাতিয়তাবাদী আরব পুঁজিপতি নেতৃত্বও ভূমি সংস্কারের কর্মসূচী চালায়। এই সমস্ত অঞ্চলের জনপ্রতি আয় আজ ভারতের চেয়ে বেশি।
ভারতে জমিদারী উচ্ছেদ করে উচ্চ বর্ণকে দুর্বল করা হয় ঠিকই কিন্তু ধনী কৃষক বা জোতদার সম্প্রদায়কে (যারা প্ররম্পরার দিক থেকে মূলত মধ্য বর্ণ এবং ১৯৯০ এর মণ্ডল কমিশোনের পরে ওবিসি হিসেবে সরকারি চাকরীতে সংরক্ষণ আদায় করে) শক্তিশালীই রাখা হয়। পশ্চিম বঙ্গের ওপারেশন বর্গা এদের দুর্বল করে ফলনের মালিকানা ভাগচাষীকে (মূলত দলিত ও মুসলমান ও কিছু মধ্য বর্ণ) দেয় ঠিকই কিন্তু জমির মালিকানা মধ্য বর্ণের জোতদারদের হাতেই থেকে যায়। ভারতের অন্যত্র প্রায় সর্বত্র এই মধ্য বর্ণরাই রাজনীতি ডমিনেট করা শুরু করে।
বিশ্বায়ণ ও উদারবাদী হাওয়ায় এরা ভারতের শহরগুলোর মাড়োয়াড়ি গুজারাতি বাণিয়াদের সাথে হাত মিলিয়ে কৃষক উচ্ছেদে মন দেয়। বাণিয়া ওবিসি পুঁজিপতি জোট ক্রমেই উচ্চ বর্ণের রাজনৈতিক পরিধি সীমিত করতে থাকে। উচ্চ বর্ণের কাজ ছিল পুঁজিপতি বাণিয়া ওবিসিদের সঙ্গে গরীব দলিত মুসলমান আদিবাসী ওবিসি বানিয়াদের একটা সমঝোউতায় নিয়ে আনা।
২০০৮ সালের বিশ্ব জোড়া মন্দা ও নন্দীগ্রাম আন্দোলনের পরে উচ্চ বর্ণকে পুরোপুরি রাজনীতি থেকে আঊট করার সিদ্ধান্ত নিয়েই মাঠে নামে অমিত শাহ (বাণিয়া) মোদী (তেলি ওবিসি)। যেহেতু তাদের বিশ্ব বাজারে প্রতিযোগিতা করার কায়দাটা আজ অচল, তাই ক্রমেই তারা অসফল হচ্ছে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে। এই অসাফল্য ক্রমেই তাদের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা কমিয়ে দিচ্ছে। উচ্চ বর্ণ নেতৃত্ব (কংগ্রেস সিজেপি ও বিজেপির মধ্যে রাজনাথ সিং-যোগী রাজপুত লবি) শাহ-মোদীকে শেষ করার গন্ধ পেয়ে গেছে। প্রয়োজনে তারা বিদেশী সাহায্য নিতেও প্রস্তুত।
সমাজতান্ত্রিক চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ায় দক্ষিণ এশিয়া বাণিয়া ওবিসি নেতৃত্বাধীন ভারতের হাতছাড়া। চীন সামরিক প্রস্তুতিও নিচ্ছে ভারতের বিরুদ্ধে। বাইরে ও ভেতরে দুই দিক থেকে ভারত হয়ে উঠছে অস্থিতিশীল।
Author: Saikat Bhattacharya