“তৃণমূল গেলে বিরোধী হিসেবে বাম আসবে”— আদৌ না


অনেকেই এখন বলছে, তৃণমূল যদি ক্ষমতা থেকে যায় তাহলে দলটা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়বে আর বিরোধী হিসেবে বামেরা আবার প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে এই বিশ্লেষণের সঙ্গে পুরোপুরি একমত নই। আমার মনে হয়, পশ্চিমবঙ্গে বামেদের পুনর্জাগরণ অদূর ভবিষ্যতে এত সহজ নয়।

কারণটা একটু বড় পরিসরে দেখতে হবে। বাম রাজনীতি যেভাবে একসময় উঠেছিল, তার পিছনে শুধু রাজ্যের পরিস্থিতি নয়, আন্তর্জাতিক একটা হাওয়াও ছিল। তখন সারা বিশ্বেই শ্রেণীভিত্তিক রাজনীতি, শ্রমিক আন্দোলন—এসব খুব শক্তিশালী ছিল। এখন ছবিটা উল্টো। দেশ-বিদেশে ডানপন্থী বা জাতীয়তাবাদী রাজনীতি অনেক বেশি প্রভাবশালী। এই পরিস্থিতিতে বাম রাজনীতির পক্ষে মাটি তৈরি হওয়া কঠিন।

বাংলার ভিতরেও অনেক কিছু বদলে গেছে। আগে বামেদের মূল শক্তি ছিল সংগঠিত শ্রমিক আর কৃষক। এখন সেই সংগঠিত শ্রমিক শ্রেণি কার্যত নেই বললেই চলে। বড় শিল্প নেই, পাট শিল্প প্রায় শেষ। উপরন্তু অটোমেশন, এআই—এসব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যতে বড় আকারে সংগঠিত ওয়ার্কিং ক্লাস তৈরি হওয়াও কঠিন হবে। গিগ ইকোনমির যুগে মানুষ আলাদা আলাদা, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে—একজোট হওয়াটাই চ্যালেঞ্জ।

কৃষিক্ষেত্রেও আগের মতো পরিস্থিতি নেই। যেসব জোতদার বা জমিদারদের বিরুদ্ধে লড়াই করে বাম রাজনীতি গ্রামে দাঁড়িয়েছিল, সেই কাঠামো এখন আর নেই। ছোট ছোট জমির মালিকানা ছড়িয়ে গেছে। সমস্যা আছে—সেচ, ফসলের দাম—কিন্তু সেগুলো নিয়ে সেই ধরনের বড় আকারের বিদ্রোহ গড়ে ওঠা খুব স্বাভাবিক নয়।

আরেকটা বড় পরিবর্তন সামাজিক। আগে যৌথ পরিবার ছিল, একটা collective mindset ছিল। এখন নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি—মানুষ অনেক বেশি নিজের দিকটা আগে দেখে। এটা খারাপ না, কিন্তু এর ফলে দীর্ঘমেয়াদি আদর্শের জন্য বড় ত্যাগ স্বীকার করার মানসিকতা কমে যায়—যেটা বাম রাজনীতির একটা বেসিক জিনিস ছিল।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও পরিস্থিতি আগের মতো নেই। একসময় রুটি-কাপড়া-মাকান বড় ইস্যু ছিল। এখন নানা ওয়েলফেয়ার স্কিমের মাধ্যমে অন্তত বেসিক জিনিসগুলো অনেকটাই কাভার হচ্ছে। ফলে শুধু অর্থনৈতিক দাবিতে মানুষ একজোট হয়ে রাস্তায় নামবে—এই সম্ভাবনা আগের মতো নেই।

তার ওপর সোভিয়েত পতনের পর বাম রাজনীতির ফোকাসও অনেকটাই বদলেছে। ক্লাস পলিটিক্স থেকে সরে এসে আইডেন্টিটি পলিটিক্স—নারীবাদ, জাতপাত, এসব বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এতে তাদের পুরনো বেসের সঙ্গে একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলেই আমার মনে হয়।

এই পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে অন্য ধরনের রাজনীতি উঠে আসতে পারে—কিছু ক্ষেত্রে পরিচয়ভিত্তিক দল, কিছু ক্ষেত্রে সরাসরি সর্বভারতীয় দলগুলোর লড়াই। তৃণমূলের ভেতরের অনেকেই বামপন্থী রাজনীতির বিরোধিতা করেই উঠে এসেছে, তাই তাদের বড় অংশ সিপিএমে যাবে—এটা খুব বাস্তবসম্মত মনে হয় না। আবার সবাই বিজেপিতেও যাবে না। ফলে নতুন নতুন সমীকরণ তৈরি হওয়াই বেশি স্বাভাবিক।

সব মিলিয়ে, শুধু “তৃণমূল গেলে বিরোধী হিসেবে বাম আসবে”—এই সরল সমীকরণটা বাস্তবে এতটা সহজ নয় বলেই আমার মনে হয়।

Author: Arkaprava Chakraborty


You may also like