নিজের চিকিৎসক সুশীলা নায়ার ও নাতনি মনু-আভাকে নিয়ে একই কম্বলের নিচে নগ্ন হয়ে ঘুমাতেন গান্ধী, নোয়াখালীতে শুরু ‘ব্রহ্মচর্য পরীক্ষা’
১৯৪৬-৪৭ সালে অবিভক্ত ভারতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় নিজের ব্রহ্মচর্য ও ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণের পরীক্ষা হিসেবে ১৯ বছর বয়সী মনু গান্ধী ও আভা গান্ধীকে নিয়ে একই কম্বলের নিচে নগ্ন অবস্থায় ঘুমাতেন মহাত্মা গান্ধী। তাঁর জীবনের শেষ পর্যায়ের এই বিতর্কিত অনুশীলন ‘ব্রহ্মচর্য পরীক্ষা’ নামে পরিচিত।
১৯৪৬ সালের শেষ দিকে তৎকালীন পূর্ববঙ্গের নোয়াখালীর দাঙ্গাকবলিত শ্রীরামপুরে এই পরীক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় শুরু হয়। ১৯০৬ সালে ব্রহ্মচর্যের ব্রত নিয়েছিলেন গান্ধী। তাঁর কাছে ব্রহ্মচর্যের অর্থ ছিল যৌন আকাঙ্ক্ষা ও ইন্দ্রিয়ের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।
১৯৪৬ সালের ডিসেম্বরে নোয়াখালীর শ্রীরামপুরে ১৯ বছর বয়সী মনু গান্ধীকে এই পরীক্ষায় যুক্ত করেন গান্ধী। মনু গান্ধী ও আভা গান্ধীর সঙ্গে একই বিছানা ও একই কম্বলের নিচে নগ্ন অবস্থায় ঘুমানোর মাধ্যমে নিজের যৌন আকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা পরীক্ষা করতেন তিনি। ঘনিষ্ঠ শারীরিক সান্নিধ্যের মধ্যেও তাঁর মনে যৌন আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয় কি না, সেটিই ছিল পরীক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য।
মনু গান্ধীর ডায়েরিতেও এ পরীক্ষার উল্লেখ রয়েছে। ১৯৪৬ সালের ২৮ ডিসেম্বরের একটি নোটে মনু গান্ধী গান্ধীকে ‘মায়ের মতো’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি লেখেন, “বাপু (গান্ধী) আমার কাছে মায়ের মতো। তিনি চরিত্র গঠনের এক উচ্চতর মানবিক স্তরে আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্যই এই ব্রহ্মচর্য পরীক্ষা করছেন।”
নোয়াখালীর দাঙ্গার কয়েক বছর আগে, ১৯৩৮ থেকে ১৯৪০ সালের দিকে ওয়ার্ধার সেবাগ্রাম আশ্রমে গান্ধী তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ড. সুশীলা নায়ারের সঙ্গেও এই ধরনের পরীক্ষা শুরু করেছিলেন বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। এতে নগ্ন অবস্থায় একসঙ্গে স্নান এবং একই বিছানায় ঘুমানোর ঘটনাও ছিল। পরে সুশীলা নায়ার গান্ধীর চিকিৎসা ও ব্যক্তিগত সেবার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন।
গান্ধীর আশ্রমজীবনে জাতীয়তাবাদী ও সমাজতান্ত্রিক নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণের স্ত্রী প্রভাবতী দেবী গান্ধীর আশ্রমে থেকে ব্রহ্মচর্যের ব্রত গ্রহণ করেন। বিভিন্ন বর্ণনায় রাতে গান্ধীর শরীর উষ্ণ রাখতে তাঁর সঙ্গে একই বিছানায় ঘুমাতেন।
গান্ধীর সহযোগী মুনশীলাল শাহের স্ত্রী কাঞ্চন শাহও কিছু সময়ের জন্য এই পরীক্ষা-প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেবাগ্রাম আশ্রমে থাকার সময় গান্ধীর সঙ্গে একই বিছানায় ঘুমাতেন।
গান্ধীর চিঠিপত্র ও আশ্রমের নথিতে লীলাবতী ও বীণার নামও পাওয়া যায়। গান্ধীর সঙ্গে ঘুমানোর পরীক্ষায় তাঁদের যুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল তবে তাঁরা এতে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানান।
গান্ধীর এই পরীক্ষা জানাজানি হলে তাঁর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও আশ্রমের সহযোগীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সহকারী পরশুরাম এবং কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ নেতা কিশোরলাল মাশরুওয়ালা এর প্রতিবাদে পদত্যাগ করেন।
জওহরলাল নেহরু ও সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল গান্ধীকে পরীক্ষা বন্ধ করার জন্য চাপ দেন। নেহরু এটিকে “অস্বাভাবিক ও বিকৃত” বলে আখ্যা দেন। প্যাটেল এটিকে গান্ধীর জীবনের সবচেয়ে বড় “ভয়াবহ ভুল” (Terrible Blunder) বলে অভিহিত করেন।
তীব্র চাপের মুখে ১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে পরীক্ষাটি স্থগিত করা হয়।
Author: Saikat Bhattacharya