world order

হিন্দী' ভারতে কারো মাতৃভাষা ছিল কি ?


যদি কৃত্তিবাস ওঝাকে জিজ্ঞেস করা হত, তিনি কোন ভাষায় রামায়ণ লিখেছেন, তিনি কী উত্তর দিতেন?

তিনি বলতেন, "বঙ্গভাষা" ।

যদি গোস্বামী তুলসীদাসকে জিজ্ঞেস করা হত, তিনি কোন ভাষায় রামায়ণ লিখেছেন, তিনি কী উত্তর দিতেন?

তিনি বলতেন, "অওয়ধী" (अवधी) ভাষা।

অথচ আজকে প্রচার করা হয়, তুলসীদাস ছিলেন হিন্দী কবি।

"হিন্দী" শব্দটা লক্ষ্য করলেই বোঝা যায়, এটা আদি ভারতীয় শব্দ নয়। এটা এদেশে এসেছে তুর্কী-পাঠান-মুঘলদের মাধ্যমে, যাঁরা সিন্ধু নদীকে হিন্দ কিম্বা হিন্দু নদী বলতেন, এবং তার এপারের দেশকে বলতেন হিন্দুস্তান।

প্রকৃতপক্ষে ভারতবর্ষে হিন্দী বলে কোনও ভাষাই ছিল না। উত্তর ভারতের ভাষাগুলি ছিল গুরুমুখী, রাজস্থানী, হরিয়ানভী, গুজরাতী, ভীল, কোল, গাহরওয়ালী, অওয়ধী, খড়িবোলী, ভোজপুরী, মগধী, মৈথিলী ইত্যাদি। আর একটু দক্ষিণে ছিল বুন্দেলখন্ডী, রোহিলখন্ডী, ছত্তিসগড়ী ইত্যাদি। ছোটনাগপুর অঞ্চলে ছিল খোরঠা, মানভূমী বাংলা, ইত্যাদি।

এছাড়া ছিল ভারতের আদি বাসিন্দাদের অস্ট্রিক-দ্রাবিড় ভাষাগুলি, যেমন সাঁওতালী, মুন্ডারী, ওরাওঁ, বিরহোড়, হো ইত্যাদি।

উত্তর ভারতের কথ্য ভাষাগুলির সঙ্গে ফারসি ভাষার সঙ্গমে সৃষ্টি হয় উর্দু নামে একটি ভাষা, যেটি মূলতঃ পাঠান এবং মুঘল সৈন্যদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। ওয়র্দ (वर्द) কথাটার মানে হল সৈন্য, যার থেকে ভাষাটির নামকরণ হয়েছে।

ইংরেজরা এসে এখানকার সব অধিবাসীদেরই নামকরণ করল নেটিভ হিন্দু, জাতিধর্মনির্বিশেষে। বলাই বাহুল্য, কথাটা খুব সম্মানজনক অর্থে তারা ব্যবহার করত না। পরাজিত জাতিকে কে-ই বা সম্মান করে? আর সরকারী ভাষা হিসেবে ইংরেজির সঙ্গে রইল ফারসি। কথ্য ভাষা হল উর্দু।

মির্জা গালিব থেকে মুনসী প্রেমচন্দ পর্যন্ত সবাই লিখতেন উর্দুতে। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের পর ইংরেজের মাথায় ঢোকে হিন্দু আর মুসলিমরা হল দুটো আলাদা ধর্মের লোক, যাদের ঐক্যে ফাটল ধরাতে না পারলে আবার অনুরূপ একটি বিদ্রোহের সম্ভাবনা। এই পরিকল্পনার অঙ্গ হিসেবে জন্ম নিল মুসলিম লীগ এবং তার হিন্দু সংস্করণ, হিন্দু মহাসভা। এবার হিন্দুদের দরকার একটা ভাষা, কারণ উর্দুটা বড্ড মুসলিম ঘেঁষা। রাতারাতি সংস্কৃত অর্থাৎ দেবনাগরী অক্ষরগুলি দিয়ে উর্দু লেখা শুরু হল। একটা জগাখিচুড়ি ভাষার সৃষ্টি করা হল, যার অধিকাংশ শব্দ উর্দু, ব্যাকরণ উর্দু, উচ্চারণও উর্দু। শুধু কিছু সংস্কৃত শব্দ ঢুকিয়ে তাকে হিন্দী ভাষা বলে চালানো হতে লাগল। মাঝখান থেকে উর্দু ভাষার যে মিষ্টতা, সেটা গেল নষ্ট হয়ে।

হিন্দী ভাষা যে আদতে উর্দু ভাষা, তার প্রমাণ এখনও এই ভাষার সর্ব অঙ্গে। প্রথমতঃ, সংস্কৃত বাক্যে কর্তার লিঙ্গ কর্তার গায়ে, কর্মের লিঙ্গ কর্মের গায়ে থাকে।

रामस्य माता। सीताया पिता।

উর্দুতে তার উল্টো। কর্মের লিঙ্গ কর্তার গায়ে চলে আসে। হিন্দীতেও তাই।

राम की माता। सीता का पिता।

এর ফলে ভারতের বেশিরভাগ লোক সঠিকভাবে হিন্দী বলতে পারে না। কারণ বেশিরভাগ ভারতীয় ভাষায় এই লিঙ্গের ঝামেলা নেই।

হিন্দীর "अ“-এর উচ্চারণ উর্দু "अलिफ"-এর মতন। মোটেই দেবনাগরী "अ"-এর মতন নয়। দেবনাগরী মানে সংস্কৃত "अ"-এর সঠিক উচ্চারণ হয় ভোজপুরী, মৈথিলী, মগধী, ওড়িয়া, অসমিয়া এইসব ভাষায়। বাংলা ভাষায কোনো কোনো শব্দে দেবনাগরী "अ"-এর উচ্চারণ হয়, যেমন বল, পথ, সরোবর ইত্যাদি, আবার কোনো কোনো শব্দে তা ও-কারের মতন উচ্চারণ হয়, যেমন মন, বন, গরু ইত্যাদি।

কিন্তু হিন্দীতে अ-এর সবসময় উর্দু अलिफ-এর মতন উচ্চারণ হয়।

সংস্কৃত শব্দের অ-কারান্ত উচ্চারণ ওড়িয়া ভাষায় রয়ে গেছে, বাংলায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে রয়েছে। কিন্তু হিন্দীতে উর্দুর হসন্তযুক্ত উচ্চারণ থেকে যাওয়ার ফলে অদ্ভুত শুনতে লাগে।

যেমন, "भारत" শব্দের উচ্চারণ "ভারত" কিন্তু "भारती" শব্দের উচ্চারণ হল "ভার্তী"। "कमल" শব্দের উচ্চারণ হল "কমল" কিন্তু "कमला" শব্দের উচ্চারণ হল "কম্লা"।

এই জগাখিচুড়ি ভাষাটিকে সরকারী ভাবে চাপিয়ে দেবার ফলে উত্তর ভারতের বেশিরভাগ ভাষা অবলুপ্ত হতে বসেছে। অনেক শিক্ষিত বাঙালি এখন ভোজপুরী, মৈথিলী, খোরঠা ইত্যাদি উত্তর ভারতের মূল ভাষাগুলিকে হিন্দীর উপভাষা বলে মনে করেন।

দুঃখের কথা হল, এমন একটা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা বলে চালানোর চেষ্টা হচ্ছে, যেটা ভারতের কোনও অঞ্চলের মানুষের মাতৃভাষা নয়। কিন্তু উত্তর ভারতের মানুষের মগজধোলাই করে তাদেরকে নিজেদের মাতৃভাষা ভুলিয়ে দিয়ে হিন্দীকে তাদের মাতৃভাষা বলে চালানো হচ্ছে।

দক্ষিণ ভারতে তামিল এবং তার আনুষঙ্গিক ভাষাগুলি যেমন মালয়ালম, কন্নড়, তেলুগু এগুলি অবশ্য তাদের অস্তিত্ব বজায় রেখেছে, আর এখনও হিন্দীর আধিপত্য অস্বীকার করে চলেছে।

যারা হিন্দু হিন্দী হিন্দুস্তান বলে লাফাচ্ছে, তারা যদি বুঝত যে এটা আসলে ফারসি ও উর্দু ভাষা, তাহলে বোধহয় লাফাত না। যাই হোক, সেটা তাদের সমস্যা।

আমাদের সমস্যা হল, আমাদের প্রিয় মাতৃভাষা বাংলা, যার প্রায় হাজার বছরের বেশি সাহিত্যের ইতিহাস আছে, কুক্কুরীপাদ, ভুসকু-র থেকে শুরু করে চন্ডীদাস, গোবিন্দদাস, কৃত্তিবাস, কাশীরাম দাস, মুকুন্দরাম,সৈয়দ আলাওল,

ভারতচন্দ্র, মাইকেল, বঙ্কিমচন্দ্র, বিদ্যাসাগর,দীনবন্ধু মিত্র, রবীন্দ্রনাথ,নজরুল, ত্রৈলোক্যনাথ, সুকুমার রায়, সৈয়দ মুজতবা আলি, পরশুরাম, শরৎচন্দ্র, প্রেমেন্দ্র মিত্র, তারাশংকর,মানিক, বিভূতিভূষণ,সমরেশ বসু,জীবনানন্দ,লীলা মজুমদার,আশাপূর্ণা, মহাশ্বেতা, উৎপল দত্ত, শম্ভু মিত্র,বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বসু, শঙ্খ ঘোষ,সুনীল , সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ, শরদিন্দু, শীর্ষেন্দু,সত্যজিৎ প্রমুখ মহামূল্যবান রত্নের সমাবেশে তৈরি এই সমৃদ্ধ ভাষা, পৃথিবীর সাহিত্য জগতে যার বেশি তুলনা পাওয়া যাবে না, সেই ভাষাও এরপর অওয়ধি, মগধী, মৈথিলী, বুন্দেলখন্ডী ভাষার মতন হিন্দীর চাপে অবলুপ্ত হয়ে যাবে কিনা।

যদিও এই এক হাজার বছর ধরে অনেক আঘাত সামলে এই ভাষা এখনও শুধু টিঁকে আছে তাই নয়, অনেক সমৃদ্ধ হয়েছে। কিন্তু ব্যবসায়ী মহলের প্রচন্ড চাপে এই ভাষা যাতে হারিয়ে না যায়, তা দেখা আপনার, আমার, সবার কর্তব্য।

( বি ভা স )

Author: Saikat Bhattacharya


You may also like



A PHP Error was encountered

Severity: Warning

Message: touch(): Unable to create file ci_session/ci_sessionk26trhjae51q75jerdi7edd8vpvoon1u because No such file or directory

Filename: drivers/Session_files_driver.php

Line Number: 252

Backtrace:

A PHP Error was encountered

Severity: Warning

Message: session_write_close(): Failed to write session data using user defined save handler. (session.save_path: ci_session, handler: CI_Session_files_driver::updateTimestamp)

Filename: Unknown

Line Number: 0

Backtrace: