world order

পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনামলে চাকুরিতে বাঙালির সাথে বৈষম্যের লোমহর্ষক চিত্র:

24-September-2025 by east is rising 227

১৯৪৭ সালে বাংলাভাষী মুসলমানের মধ্যে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস (আইসিএস) অফিসার ছিল মাত্র তিনজন।

১. মো. আখতারুজ্জামান

২. মো. নুরুন নবী

৩. মো. মোরশেদ

এই তিনজনের মধ্যে শুধুমাত্র মো. নুরুন নবী পাকিস্তানে আসেন, বাকী দুইজন হিন্দুস্তানে থেকে যান। বেঙ্গল সিভিল সার্ভিস মানে প্রাদেশিক সরকারের সেকেন্ড ক্লাস অফিসার ছিল ২৫-৩০ জন।

১৯৪৭- এর ভারতভাগের সময় পূর্ব বাংলার ৯৯% ডাক্তার, ৯৯% জমিদার, ৯৯% বিচারপতি, ৯৫% শিক্ষক, ৯৮% সরকারি অফিসার, ৯৫% পুলিশ অফিসার, ৯৫% উকিল, ৯৫% মহাজন, ৯৫% বড় ব্যবসায়ী ছিল হিন্দু।

বাংলাভাষী মুসলমান ছিল উপমহাদেশের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অন্যতম।

গোটা পূর্ব পাকিস্তানে একটি মাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক বেশিরভাগই ছিল হিন্দু। ঢাবির সাবেক ভিসি ড. সাজ্জাদ হোসায়েন বলেছিলেন,

❝ আমি যখন ১৯৩৮ সালে ফার্স্ট ইয়ারে ইংলিশ ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হই তখন আর্টস ফ্যাকালটিতে আরবী এবং উর্দু-ফার্সি ডিপার্টমেন্টকে বাদ দিলে মুসলমান শিক্ষক ছিলেন মাত্র ৩ জন। ইংলিশ ডিপার্টমেন্টে ড. মাহমুদ হাসান, বাংলার ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এবং ইতিহাসের ড. মাহমুদ হোসেন। ❞

৪৭ এর দেশভাগের পরে হিন্দুদের বড় অংশ পূর্ববাংলা ছেড়ে পশ্চিমবাংলায় চলে যায়। ফলে পূর্ববাংলায় একটা ভয়াবহ শূন্যতা তৈরি হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষক শূন্য হয়ে যায়।

অবস্থা সামাল দিতে জগন্নাথ কলেজ, ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন কলেজ থেকে ছাত্র এবং শিক্ষক এনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকানো হয়। জগন্নাথ কলেজের একটা শিক্ষাবর্ষ বন্ধ করে দেওয়া হয়, সব ছাত্রদের আনা হয় ঢাবিতে।

১৯৪৭ সালের শেষদিকে পূর্ব পাকিস্তান থেকে সেন্ট্রাল সার্ভিসের জন্য অনেক অফিসার রিক্রুট করা হয়। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা অনুষ্ঠানের সময় ছিল না, শুধু ইন্টারভিউ করে কাউকে ফরেন সার্ভিসে, কাউকে অডিট সার্ভিসে নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

পূর্ব পাকিস্তানের কলেজে-কলেজে রিক্রুটমেন্ট টিম ঘুরে বেড়িয়ে লোক সংগ্রহ করেন। এই সময়ে বার্মায় রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ পান ঢাকার আর্মানিটোলা হাই স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক কমর উদ্দিন আহমেদ।

অন্যদিকে দেশের অন্যপ্রান্ত মাগরেবি পাকিস্তানে আইসিএস অফিসারই ছিল ১০০ জনের বেশি।

এছাড়া ভারতের দিল্লি, আগ্রা, লক্ষ্ণৌ, হায়দারাবাদ ছিল মিডেলক্লাস মুসলমানদের ডমিনেটেড শহর। উত্তর প্রদেশেও মুসলমানদের মধ্যে একটা সমৃদ্ধ মিডেলক্লাস ছিল। এই শহরগুলোর সব গুরুত্বপূর্ণ পদের একটা বড় অংশ ছিল মুসলমান। এসব মুসলমানদের একটা বড় অংশ পশ্চিম এবং পূর্ব পাকিস্তানে হিজরত করে।

স্বাভাবিক ভাবেই ভারত থেকে পাকিস্তানে হিজরত করে আসা অবাঙালি অফিসারেরা বাকী শূন্য পদে নিয়োগ পান।

রাতারাতি কেরানি থেকে অফিসার, কলেজের শিক্ষক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, স্কুলের শিক্ষক থেকে রাষ্ট্রদূত হয়ে যাবার পরেও বাঙালি রাজনীতিবিদরা অত্যন্ত অযাচিতভাবে বৈষম্যের প্রোপাগান্ডা শুরু করে।

◼️

১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানদের শিক্ষার হার ছিল ৫%- এরও কম, অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানে শিক্ষার হার ছিল ২০%- এর আশেপাশে।

তবে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, পশ্চিম পাকিস্তানে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ১২ টি। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ ছাত্র এবং শিক্ষক ছিল মুসলমান। আগেই উল্লেখ্য পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ ছাত্র-শিক্ষক ছিল হিন্দু, যারা ভারতে চলে যায়। অন্যদিকে ভারতের শিক্ষিত এবং সম্পদশালী হাজার হাজার মুসলমান পাকিস্তানে হিজরত করে চলে আসে।

তাই স্বাভাবিক ভাবেই চাকুরিতে মেধার জোরে ভারত থেকে হিজরত করা শিক্ষিত মুহাজির এবং পশ্চিম পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গ্রাজুয়েটরা এগিয়ে থাকে। যেটা খুবই স্বাভাবিক।

এমনকি বর্তমান বাংলাদেশেও ভারত থেকে হিজরত করে আসা মুসলমানদের একটা প্রধান্য আছে-বদরুদ্দীন উমর, আনিসুজ্জামান, নায়ক রাজ্জাক, রেহমান সোবহান, প্রেসিডেন্ট এরশাদ, জাফর সোবহান প্রমুখ সাতচল্লিশ সালে ভারত থেকে মাশরেকি পাকিস্তানে এসেছিলো। আবার ভারতেও পাকিস্তান থেকে চলে যাওয়া হিন্দুরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে অসীন হয়েছে।

এটা ছিল উপমহাদেশের একটা স্বাভাবিক বাস্তবতা। এই স্বাভাবিক অবস্থাকে বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা বিশাল ইস্যু বানিয়ে হৈচৈ শুরু করে। এবং তারা ছিল উগ্র রেসিস্ট। বাঙালি জাতীয়তাবাদিরা ভারত থেকে আসা অবাঙালি অফিসারদের নিয়ে বিষোদগার, তাদের উপর প্রাণঘাতী হামলা, অনেককে হত্যা পর্যন্ত করলেও ভারতের একই এলাকা থেকে আসা বাঙালি অফিসারদের বিরুদ্ধে কোন কথা বলে নাই।

এই সংকট নিরসনে আইয়ুব খান কোটা পদ্ধতি চালু করে। নিয়ম হয় ৪০% ভাগ চাকুরি পাবে পূর্ব পাকিস্তান ৪০% ভাগ পশ্চিম পাকিস্তান এবং ২০% আসবে মেধা ভিত্তিতে। এই কোটা পদ্ধতির কারনে অনেক কম নম্বর পেয়েও পূর্ব পাকিস্তানের গ্রাজুয়েটরা পিসিএসে চাকুরি পাওয়া শুরু করে।

এতে অবস্থার উন্নতি হয়। প্রশাসনে বাঙালিদের পরিমাণ বাড়তে থাকে। ১৯৭১ সাল নাগাদ সরকারি গেজেটেড কর্মকর্তাদের মধ্যে বাঙালির সংখ্যা ছিল ১৯৬ জন। আর "উপনিবেশি"পাঞ্জাবি কর্মকর্তার সংখ্যা ছিল ১৯৯। পশ্চিম পাকিস্তানের মোট অফিসারের সংখ্যা ছিল মোট ৩০০- এর কিছু বেশি।

১৯৭০ সালের আগস্ট মাসে ইয়াহিয়া অসামরিক ব্যক্তিদের নিয়ে ১০ সদস্যের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা গঠন করেন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন ছিলেন বাঙালি-এ কে এম হাফিজুদ্দিন, শামসুল হক, আহসানুল হক, ডা. আবদুল মোতালেব মালেক ও অধ্যাপক গোলাম ওয়াহেদ চৌধুরী। ছয়জন বাঙালি সিএসপি কর্মকর্তাকে কেন্দ্রীয় সরকারের সচিব পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। সব মন্ত্রণালয়ে নির্দেশ যায়, কোনো পদ শূন্য হলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যেন বাঙালিদের নিয়োগ দেওয়া হয়।

বাংলাদেশের বর্তমান বুদ্ধিজীবীদের একটা বড় অংশ সেই কোটায় চাকুরি পাওয়া। তবে কোনো বছরই পূর্ব পাকিস্তানের কোটা পূর্ণ হতো না। প্রতিবছর অনেক আসন ফাঁকা থাকত৷ অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানের কেউ কোনোমতে লিখিত পরীক্ষায় পাশ করলেই চাকরি পেয়ে যেত৷ অন্যদিকে অনেক বেশি নম্বর পেয়েও চাকুরি পেত না পশ্চিমের শিক্ষার্থীরা। এই কোটার ফলে পশ্চিম পাকিস্তানের গ্রাজুয়েটদের মধ্যে বিরুপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।

এরপরেও বাঙালি বুদ্ধিজীবী এবং রাজনীতিবিদদের বৈষম্যের প্রোপাগান্ডা চলতেই থাকে।

বাঙালি বুদ্ধিজীবী এবং রাজনীতিবিদদের এই অব্যাহত প্রচারণা পশ্চিম পাকিস্তানিদের স্থূল একাংশক ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে যায়। তারাও এই মত দেওয়া শুরু করে, পূর্ব পাকিস্তান চাইলে আলাদা হয়ে যাক।

সমতা মানে ইকুয়াল রেজাল্ট নয়, সমতা মানে ইকুয়াল অপরচুনিটি। বর্তমান বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন, বিসিএসে চাকুরি প্রাপ্তদের কমপক্ষে ৭০ ভাগই থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট। টুঙ্গিপাড়ার গ্রাজুয়েটদের মধ্য থেকে দশ/পনের বছর পর পর ১ জন চান্স পায় আবার পায় না। এর মানে এটা নয় যে টুঙ্গিপাড়া গ্রাজুয়েটদের সাথে বৈষম্য করা হচ্ছে। বাঙালি ঠিক এই রকম হাস্যকর অসমতার অভিযোগ আনে।

সমধিকারের নামে বাঙালি আদতে চাকুরিতে সমান সংখ্যক ঢাবি গ্রাজুয়েট এবং টুঙ্গিপাড়া গ্রাজুয়েট দেখতে চেয়েছিল।

[সূত্র:

১. স্বাধীনতার ৫০ বছর, বিবিসি রিপোর্ট, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১

২. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন, একাত্তরের স্মৃতি

৩. মহিউদ্দিন আহমেদ, আওয়ামী লীগ: উত্থানপর্ব ১৯৪৮-১৯৭০

৪. Fifty years of Bangladesh: Prof Taj Hashmi

Shihab S]

Author: Saikat Bhattacharya


You may also like



A PHP Error was encountered

Severity: Warning

Message: touch(): Unable to create file ci_session/ci_session77c2d2ea4eb0b49d313bf37057c8458ec3d1d502 because No such file or directory

Filename: drivers/Session_files_driver.php

Line Number: 252

Backtrace:

A PHP Error was encountered

Severity: Warning

Message: session_write_close(): Failed to write session data using user defined save handler. (session.save_path: ci_session)

Filename: Unknown

Line Number: 0

Backtrace: