বাঙালীর ভুঁড়ি
ভারতীয়দের মধ্যে একটা অদ্ভুত চেহারা আমরা বারবার দেখি—দেখতে রোগা-পাতলা, কিন্তু পেটের চারপাশে চর্বি। একটা ছোট্ট ভুঁড়ি। মোটা না হলেও ডায়াবেটিস, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, fatty liver—সবই খুব তাড়াতাড়ি দেখা যায় ভারতীয়দের। একে ডাক্তারি পরিভাষায় বলা হয় “Thin-fat Indian phenotype.” বাঙালিদের তো এটা আরও বেশি দেখা যায়। এর পেছনে কারণ কিন্তু শুধু এখনকার খাবার বা ব্যায়ামের অভাব নয়; এর আসল কারণ দেখতে হলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে প্রায় আড়াইশো বছর।
মনে আছে, ব্রিটিশরা ভারত দখল করার পরই বাংলার ইতিহাসে নেমে এল দু’দু’বারের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ—১৭৭০ সালের গ্রেট বেঙ্গল ফেমিন এবং যাবার আগে ১৯৪৩ সালের বেঙ্গল ফেমিন? ব্রিটিশ নীতির ফলে ১৭৭০-এর দুর্ভিক্ষে বাংলার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মারা যায়। শুধু তা-ই নয়, এরপর বহু দশক ধরে কৃষি, পুষ্টি—সবই ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত থাকে। কয়েক প্রজন্ম ধরে মানুষ অপুষ্টির ভার বইতে থাকে।
এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশদের নীতিতে আবার ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ—যেখানে ২৫–৩০ লক্ষ বাঙালি মারা যায়। যারা বেঁচে রইল, তারা বহু বছর ধরে চরম অপুষ্টিতে কাটাল। সেই সময়কার বাচ্চারা, তাদের পরের প্রজন্ম, তারও পরের প্রজন্ম—সবাই এই দীর্ঘ অপুষ্টির ছাপ শরীরের ভেতরে বয়ে নিয়ে চলেছে। আর যখনই এখন খাদ্যের প্রাচুর্য মিলছে, আর বয়সের সঙ্গে খেলাধুলো ও ব্যায়াম কমে যাচ্ছে, শরীর সেই প্রাচুর্যের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছে না। তৈরি হচ্ছে এক ধরনের metabolic mismatch, যার ফলেই রোগা শরীরে ছোট্ট নেয়াপাতি ভুঁড়ি সহ নানা বিপাকীয় রোগ দেখা দিচ্ছে।
এই ধারণাটাকে অসাধারণভাবে প্রমাণ করেছিল ২০১৫ সালে Cell Metabolism–এ প্রকাশিত এক গবেষণা। সেখানে ইঁদুরকে টানা ৫০ প্রজন্ম ধরে কম প্রোটিন ও কম ক্যালোরির ডায়েট দেওয়া হয়েছিল। এতদিনের অপুষ্টির পর হঠাৎ যখন তাদের ভালো, স্বাভাবিক খাবার দেওয়া হল, তখন দেখা গেল তাদের সন্তানরা জন্মাচ্ছে একেবারে thin-fat—জন্মের সময় ওজন কম, পেশি কম, কিন্তু বয়স বাড়লে পেট ও লিভারের চারপাশে বেশি ফ্যাট জমছে, আর ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স খুব তাড়াতাড়ি দেখা দিচ্ছে।
অদ্ভুত ব্যাপার হল—গবেষকেরা দুই প্রজন্ম ধরে ভালো খাবার খাওয়ালেও সমস্যাগুলো ঠিক করতে পারেননি। বরং পরের প্রজন্মে visceral fat আরও বেড়েছে, insulin resistance আরও খারাপ হয়েছে, আর ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি ৮ গুণ বেড়ে গেছে। শরীর যেন হঠাৎ ‘ভালো খাবার’ সামলাতেই পারছে না—এই-ই সেই metabolic mismatch।
মনে হতে পারে—বংশের পর বংশ যদি এরকম হয়, তাহলে কি এটা জেনেটিক? না, সমস্যা জিনে নয়, সমস্যা এপিজেনেটিক। অপুষ্টির ফলে ইনসুলিন বা metabolism-সংক্রান্ত জিন খারাপ হয়নি; খারাপ হয়েছে জিনের ওপর বসা নিয়ামক স্তরগুলো—epigenetic marks। সেই বাধাগুলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে থেকে গেছে। ফলে পরে নাতিপুতিরা ভালো খাবার খেলেও সেই বাধা পুরোপুরি মুছছে না—আর সেখান থেকেই metabolic disease–এর ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে।
সহজ ভাষায় বললে—যে পরিবার বহু প্রজন্ম অপুষ্টিতে ছিল, তারা হঠাৎ ভালো খাবার পেলেই সব ঠিক হয়ে যায় না। শরীরের ভেতরের প্রোগ্রামিং, সেই অপুষ্টির এপিজেনেটিক স্মৃতি বহু প্রজন্ম ধরে metabolic disease-এর ভিত্তি তৈরি করতে থাকে। তাহলে বুঝতে পারছেন—আমাদের ভুঁড়ির জন্য আসলে কে দায়ী?
“আড়াইশো বছরের জমিদারী ঘুচে গিয়ে
দেশ ছেড়ে পালিয়েছে ইংরেজ,
নখ-দাঁত ভাঙা এক মৃত সিংহ সে যে
নেই তার জারিজুরি, নেই তেজ—“
কিন্তু পালাবার আগে বাঙালিকে দিয়ে গেছে দুই উপহার—Partition আর “Thin-fat Indian phenotype.”
- নির্মাল্য দাশগুপ্ত ও ChatGPT
Reference: Multigenerational Undernutrition Increases Susceptibility to Obesity and Diabetes that Is Not Reversed after Dietary Recuperation�Hardikar, Anandwardhan A. et al.�Cell Metabolism, Volume 22, Issue 2, 312 - 319
Author: Saikat Bhattacharya