মহারাজা কেদারনাথ দেবরায় (১৫৬১-১৬০৩ খ্রি.)

29-August-2025 by east is rising 378

Sufal Sarkar
মহারাজা কেদারনাথ দেবরায় (১৫৬১-১৬০৩ খ্রি.) ছিলেন বাংলার বারো ভুঁইয়াদের অন্যতম শক্তিশালী এবং বিখ্যাত শাসক, যিনি মুঘল আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে বিক্রমপুরে স্বাধীন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি মুঘল-রাজপুত জোটের সৈন্যদলকে চারটি বিধ্বংসী যুদ্ধে পরাজিত করে এবং উপকূলীয় অঞ্চলে পর্তুগিজ ও আরাকানি মগ জলদস্যুদের দমন করে বাঙালিদের রক্ষা করেছিলেন। তাঁর শাসনাধীন বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মধ্যে ছিল ঢাকা, বিক্রমপুর, কুমিল্লা, সিলেট, নোয়াখালী ও চাঁদপুরের বৃহৎ অংশ।

কেদার রায় বিক্রমপুরে জন্মগ্রহণ করেন এবং তাঁর পিতা যাদব রায়ের মাধ্যমে দেববংশী বঙ্গজ কায়স্থ বংশের উত্তরাধিকার লাভ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষ নিম রায় সম্ভবত সেন আমলে বিক্রমপুরের আড়া ফুলবাড়িয়ায় বসতি স্থাপন করেছিলেন এবং ভুঁইয়া উপাধি লাভ করেছিলেন। কেদার রায়ের রাজধানী ছিল শ্রীপুর, যা বর্তমানে শরীয়তপুর জেলার কালীগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত ছিল। তাঁর রাজত্ব পদ্মা নদীর দুই তীরের বিস্তীর্ণ জনপদ জুড়ে বিস্তৃত ছিল, যার মধ্যে ইদ্রাকপুর, ইদিলপুর, কেদারপুর এবং চাঁদপুর অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে পদ্মা নদীর ভাঙনে শ্রীপুরসহ তাঁর রাজ্যের অনেক স্মৃতিচিহ্ন বিলীন হয়ে গেছে।

কেদার রায় একজন দক্ষ শাসক ও যোদ্ধা ছিলেন। তিনি একটি শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ে তুলেছিলেন এবং পর্তুগিজ নাবিক ডোমিনিঙ্গ কার্ভালোকে এর নেতৃত্বে নিয়োগ করেছিলেন। তাঁর নৌবাহিনী সন্দ্বীপে মগ ও মুঘলদের বিরুদ্ধে বিধ্বংসী যুদ্ধে জয়ী হয়েছিল। আরাকান রাজা মেংরাজাগির ১৫০ রণতরীর আক্রমণ প্রতিহত করে তিনি ১৪০টি তরী দখল করেন এবং পরবর্তীতে ১০০০ রণতরীর আক্রমণেও মগ বাহিনীকে পরাজিত করেন। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বিরুদ্ধেও তিনি কালিন্দী নদীতে মন্দা রায়ের নেতৃত্বে মুঘল নৌবাহিনীকে পরাজিত করেন, যেখানে মুঘল সৈন্যদের রক্তে নদীর জল রঞ্জিত হয়েছিল।

কেদার রায়ের ঈসা খাঁর সঙ্গে প্রাথমিকভাবে বন্ধুত্ব ছিল এবং তারা একসঙ্গে আরাকান রাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু ঈসা খাঁর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শত্রুতায় রূপান্তরিত হয় যখন ঈসা খাঁ জোরপূর্বক কেদার রায়ের বিধবা কন্যা স্বর্ণময়ীকে বিয়ে করেন। এই ঘটনায় ক্রুদ্ধ হয়ে কেদার রায় ঈসা খাঁর কলাগাছিয়া দুর্গ আক্রমণ করে ধ্বংস করেন এবং তাঁর রাজধানী পর্যন্ত আক্রমণ চালান।

কেদার রায়ের জীবন ট্র্যাজেডিতে পরিপূর্ণ। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের সঙ্গে চতুর্থ যুদ্ধে ফতেহজঙ্গপুরে তিনি নিহত হন।

কথিত আছে, যুদ্ধের নবম দিনে তিনি কামানের গোলার আঘাতে মূর্ছিত হন এবং পরে বন্দী অবস্থায় মারা যান। আরেকটি বর্ণনায় বলা হয়, তিনি ধ্যানস্থ অবস্থায় ছিন্নমস্তার পূজা করার সময় গুপ্তঘাতকের হাতে নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর পর মুঘলরা তাঁর রাজ্য লুণ্ঠন করে এবং শ্রীপুর পদ্মার গর্ভে বিলীন হয়।

কেদার রায়ের স্মৃতি বিক্রমপুরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে আছে। তিনি দিগম্বরী দেবীর দীঘি, কেশব মায়ের দীঘি এবং শ্রীপুরে রাজবাড়ির মঠসহ অসংখ্য মন্দির ও দীঘি নির্মাণ করেছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ভুবনেশ্বরী মূর্তি এখনও নদীয়ার লাখুরিয়ায় সংরক্ষিত আছে। তবে পদ্মার ভাঙনে তাঁর রাজধানী ও অনেক কীর্তি হারিয়ে গেছে, যার জন্য পদ্মা এই অঞ্চলে ‘কীর্তিনাশা’ নামে পরিচিত।

কেদার রায়ের বীরত্ব ও দেশপ্রেম বাংলার ইতিহাসে অমর। তিনি বারো ভুঁইয়াদের একত্রিত করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তাঁদের মধ্যে রেষারেষির কারণে তিনি শেষ পর্যন্ত সফল হননি। তবুও তাঁর প্রজাবাৎসল্য, শাসনকৌশল এবং মুঘলদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তাঁকে বাংলার এক অক্ষয় বীর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

কিন্তু এসব বীরত্বপূর্ণ ইতিহাস আমাদের পড়ানো হয় না, আমরা জানিই না ব্রাত্য করে রাখা হয়েছে । শুধু মুঘল ইতিহাসের কাহিনীই আমাদের জানানো হয়, এখানেই দুঃখ । তাই তোসুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আক্ষেপ করে বলেছেন, "বাংলার বারো ভুঁইয়ারা ইতিহাসে উপেক্ষিত হলেও, কেদার রায়ের মতো বীর যোদ্ধারা বাঙালির গর্বের প্রতীক।"

যাইহোক, লেখাটি ভালো লাগলে অবশ্যই অবশ্যই একটা লাইক, কমেন্ট, শেয়ার করে সকলের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার অনুরোধ রইলো ।

 

Author: Saikat Bhattacharya


You may also like



A PHP Error was encountered

Severity: Warning

Message: touch(): Unable to create file ci_session/ci_sessionojbc7fo1un6osklt35bbgq6t3hbnc9as because No such file or directory

Filename: drivers/Session_files_driver.php

Line Number: 252

Backtrace:

A PHP Error was encountered

Severity: Warning

Message: session_write_close(): Failed to write session data using user defined save handler. (session.save_path: ci_session, handler: CI_Session_files_driver::updateTimestamp)

Filename: Unknown

Line Number: 0

Backtrace: