Saiful Islam
কোরীয় যুদ্ধ (১৯৫০-১৯৫৩) এবং প্রথম তাইওয়ান প্রণালী সংকটের (১৯৫৪-১৯৫৫) সময় যুক্তরাষ্ট্র বেশ কয়েকবার চীনের ওপর পারমাণবিক হামলার হুমকি দেয়। এই ঘটনাগুলো চীনের তৎকালীন নেতা মাও সেতুংকে গভীরভাবে চিন্তিত করে। তিনি বুঝতে পারেন যে, পশ্চিমা বিশ্বের "পারমাণবিক ব্ল্যাকমেইল" থেকে বাঁচতে এবং বিশ্বমঞ্চে নিজেদের শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করতে চীনের নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্র থাকা অপরিহার্য। মাও বলেছিলেন, "আজকের বিশ্বে আমরা যদি চাই কেউ আমাদের হেনস্তা না করুক, তবে আমাদের এই জিনিসটা (পরমাণু বোমা) লাগবেই।"
চীনের নিজস্ব কোনো উন্নত প্রযুক্তি বা পারমাণবিক বিজ্ঞানী ছিল না। তাই তারা তাদের মিত্র সোভিয়েত ইউনিয়নের দ্বারস্থ হয়। ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে দুই দেশের মধ্যে পারমাণবিক প্রযুক্তি বিনিময়ের চুক্তি হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন চীনে তাদের বিশেষজ্ঞ পাঠায়, পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণে সাহায্য করে এবং এমনকি পরমাণু বোমার একটি প্রোটোটাইপ বা নকশা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।
১৯৫০-এর দশকের শেষের দিকে আদর্শগত কারণে মাও সেতুং এবং সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভের মধ্যে সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। ১৯৫৯ সালের জুন মাসে সোভিয়েত ইউনিয়ন পারমাণবিক সহায়তা চুক্তি বাতিল করে এবং তাদের সমস্ত বিশেষজ্ঞদের চীন থেকে প্রত্যাহার করে নেয়। তারা পরমাণু বোমার নকশাও দেয়নি।
সোভিয়েতদের এই আকস্মিক প্রস্থানের পর চীন সিদ্ধান্ত নেয় তারা সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে বোমা বানাবে। ১৯৫৯ সালের জুন (৫৯-৬) মাসকে স্মরণ রাখতে এই পারমাণবিক প্রকল্পের সাংকেতিক নাম দেওয়া হয় "প্রজেক্ট ৫৯৬" (Project 596)।
সোভিয়েত সহায়তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর, পশ্চিমা দেশগুলোতে পড়াশোনা করা বেশ কয়েকজন প্রতিভাবান চীনা বিজ্ঞানী দেশে ফিরে আসেন এবং এই প্রকল্পের হাল ধরেন। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন:
- দেং জিয়াক্সিয়ান (Deng Jiaxian): তাকে "চীনের পরমাণু বোমার জনক" বলা হয়।
- কিয়ান সানকিয়াং (Qian Sanqiang): তিনি গবেষণার দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন।
- কিয়ান শুয়েসেন (Qian Xuesen): যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটি-তে পড়া এই বিজ্ঞানী চীনের মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি উন্নয়নে মূল ভূমিকা রাখেন।
তারা চরম গোপনীয়তায় এবং অত্যন্ত সীমিত সম্পদের মধ্যে কাজ শুরু করেন। এমনকি সঠিক কম্পিউটারের অভাবে তারা ম্যানুয়ালি বা অ্যাবাকাস ব্যবহার করে জটিল গাণিতিক হিসাব-নিকাশ করেছিলেন।
বেশিরভাগ দেশ (যেমন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত) তাদের প্রথম পরীক্ষার জন্য প্লুটোনিয়াম ব্যবহার করলেও, চীন সিদ্ধান্ত নেয় তারা ইউরেনিয়াম-২৩৫ (U-235) ব্যবহার করে ইমপ্লোশন-টাইপ (Implosion-type) বোমা তৈরি করবে, যা প্রযুক্তিগতভাবে অনেক বেশি জটিল ছিল। তারা লানচৌ (Lanzhou) নামক স্থানে একটি বিশাল গ্যাসিয়াস ডিফিউশন প্ল্যান্ট তৈরি করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করে।
অবশেষে দীর্ঘ গবেষণার পর, ১৬ অক্টোবর, ১৯৬৪ সালে চীনের জিনজিয়াং প্রদেশের লপ নুর (Lop Nur) মরুভূমির পরীক্ষা কেন্দ্রে চীন তাদের প্রথম পরমাণু বোমার সফল বিস্ফোরণ ঘটায়। এই বোমার ক্ষমতা ছিল প্রায় ২২ কিলোটন (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিরোশিমায় ফেলা বোমার প্রায় সমান)। এই সফল পরীক্ষার মাধ্যমে চীন বিশ্বের পঞ্চম পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে (যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের পর)।
এর মাত্র ৩২ মাস পর, ১৯৬৭ সালে চীন সফলভাবে তাদের প্রথম থার্মোনিউক্লিয়ার বা হাইড্রোজেন বোমা পরীক্ষা করে, যা ছিল পারমাণবিক বোমা থেকে হাইড্রোজেন বোমায় উত্তরণের ক্ষেত্রে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুততম রেকর্ড।
Author: Saikat Bhattacharya