ডার্ক ম্যাটার গড়ছে আর ডার্ক এনার্জি ভাংছে?

24-June-2026 by east is rising 1

কোটি কোটি নক্ষত্র, ছায়াপথ আর নীহারিকার আলোয় ঝলমলে এক শান্ত, সুশৃঙ্খল মহাবিশ্ব। ​কিন্তু মহাবিশ্ব আমাদের সাথে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধোঁকাবাজিটা করছে।

​আপনি, আমি, জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ কিংবা কোটি কোটি গ্যালাক্সির রূপালী আলো যা কিছু আমরা আজ পর্যন্ত দেখতে পেয়েছি বা ছূঁতে পেরেছি, তা আসলে এই অনন্ত মহাবিশ্বের কতটুকু জানেন? মাত্র ৫ শতাংশ!

​বাকি ৯৫ শতাংশ মহাবিশ্ব সম্পূর্ণ গায়েব! আমরা এক বিশাল, অদৃশ্য মহাসমুদ্রের বুকে ভাসছি, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে আমরা প্রায় অন্ধ। ​তাহলে কী লুকিয়ে আছে এই করাল অন্ধকারে? বিজ্ঞানীদের ঘুম উড়িয়ে দেওয়া সেই গল্পটা শুরু হয়েছিল ১৯৩০-এর দশকে।

​জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা যখন দূরান্তের গ্যালাক্সিগুলোর ঘূর্ণন গতি মাপলেন, তখন তাঁদের মেরুদণ্ড দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। গ্যালাক্সিগুলো এত অবিশ্বাস্য গতিতে ঘুরছিল যে, পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী সেগুলোর ভেতরের নক্ষত্র, গ্রহ সব ছিটকে মহাশূন্যে হারিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল পুরো গ্যালাক্সির।

​কিন্তু তারা ছিটকে যাচ্ছে না! কোনো এক অদৃশ্য, দানবীয় হাত পুরো গ্যালাক্সিকে শক্ত মুঠোয় চেপে ধরে রেখেছে।

​বিজ্ঞানীরা এর নাম দিলেন: ডার্ক ম্যাটার।

​এটি কোনো আলো ছাড়ে না, আলো গিলে খায় না, এমনকি আলো এর ওপর পড়লে প্রতিফলিতও হয় না। অর্থাৎ, আপনার সামনে যদি এক পাহাড় সমান ডার্ক ম্যাটার এনে রাখা হয়, আপনি তার আরপার সবকিছু দেখতে পাবেন, অথচ সেখানে ধাক্কাও খাবেন না!

​সে এক পরম ভূতুরে অস্তিত্ব। সে যেন মহাবিশ্বের এক অদৃশ্য স্থপতি, যে নিজের কাঁধে করে পুরো মহাজাগতিক কাঠামোকে ধরে রেখেছে। যদি আজ ডার্ক ম্যাটার উধাও হয়ে যায়, তবে মুহূর্তের মধ্যে আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে!

রহস্যের এখানেই শেষ নয়। ১৯৯৮ সালে মহাবিশ্ব বিজ্ঞানীদের মুখে ছুঁড়ে দিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কসমিক টুইস্ট! ​বিজ্ঞানীরা মহাজাগতিক বিস্ফোরণ বা সুপারনোভা পরীক্ষা করে ভেবেছিলেন, মহাকর্ষের টানে মহাবিশ্বের প্রসারণের গতি হয়তো আস্তে আস্তে কমে আসছে। কিন্তু ডেটা কম্পিউটারের স্ক্রিনে ভেসে উঠতেই বিজ্ঞানীদের চোখ কপালে উঠল। ​মহাবিশ্বের গতি কমছে না বরং তা অপ্রতিরোধ্য গতিতে, ক্রমশ আরও দ্রুত থেকে দ্রুততর হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে!

​মহাকর্ষের নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কোন সে আদিম শক্তি, যা পুরো স্থান বা স্পেসকে বেলুনের মতো ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তুলছে? কে ঠেলছে এই মহাবিশ্বকে? ​তার নাম দেওয়া হলো ডার্ক এনার্জি। মহাবিশ্বের প্রায় ৬৮% এলাকাজুড়ে রাজত্ব করছে এই ভৌতিক শক্তি।

মহাবিশ্ব এখন যেন মেতে উঠেছে এক অনন্ত, মহাজাগতিক টাগ-অব-ওয়ার বা দড়ি টানাটানি খেলায়! ​একদিকে ডার্ক ম্যাটার, যে তার মহাকর্ষের অদৃশ্য মায়াজালে সবকিছুকে একসাথে বেঁধে রাখতে চাইছে। গ্যালাক্সি গড়ছে, প্রাণ সৃষ্টির সুযোগ করে দিচ্ছে। ​অন্যদিকে ডার্ক এনার্জি, যে এক উন্মাদ দানবের মতো স্থান-কালকে চাবুক মেরে সবকিছুকে একে অপরের থেকে দূরে, বহুদূরে ঠেলে দিচ্ছে। একটি তৈরি করছে, অন্যটি ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। অদ্ভুত এক যুদ্ধক্ষেত্রের মতো।

আর আমরা? আমরা দাঁড়িয়ে আছি এই মহাকাব্যিক নাটকের মঞ্চে। সবচেয়ে রোমাঞ্চকর আর ভয়ের বিষয় কী জানেন? এই খেলায় ডার্ক এনার্জি জিতে যাচ্ছে! মহাবিশ্বের প্রসারণের গতি যেভাবে বাড়ছে, তাতে কোটি কোটি বছর পর আকাশের বাকি সব গ্যালাক্সি আমাদের থেকে এত দূরে চলে যাবে যে, রাতের আকাশ হয়ে যাবে সম্পূর্ণ কুচকুচে অন্ধকার।

আজকের আধুনিক বিজ্ঞান এত উন্নত, অথচ আমরা এখনো জানি না ডার্ক ম্যাটার আসলে কী কণা দিয়ে তৈরি, আর ডার্ক এনার্জির আদি উৎসটাই বা কী! মহাবিশ্বের সিংহভাগ জুড়ে রাজত্ব করা এই দুই সম্রাট আমাদের আধুনিক বিজ্ঞান, ল্যাবরেটরি আর টেলিস্কোপকে প্রতিনিয়ত উপহাস করে চলেছে।

​হয়তো আগামী দিনে কোনো এক নতুন আইনস্টাইন এসে উন্মোচন করবেন এই পরম রহস্যের পর্দা। কিংবা হয়তো, আমরা এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি, যা আমাদের চেনা পদার্থবিজ্ঞানের সব বইকে চিরদিনের জন্য ভুল প্রমাণ করে দেবে! ​কারণ মহাবিশ্বের আসল রোমাঞ্চ সেই আলোতে নেই যা আমরা দেখতে পাই। আসল রোমাঞ্চ তো লুকিয়ে আছে সেই গা ছমছমে অন্ধকারে, যা আমরা অনুভব করি, কিন্তু এখনো ছুঁতেইইই পারিনি

Author: Saikat Bhattacharya


You may also like