চীনের জলচক্র বদলে দিয়েছে অরণ্যায়ণের সাফল্য

12-December-2025 by east is rising 49

গত কয়েক দশকে চীন যেভাবে বন ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে, তা দেশটির জলচক্রকে এতটাই সক্রিয় করে তুলেছে যে পানি এখন এমন সব নতুন পথে সঞ্চালিত হচ্ছে, যা বিজ্ঞানীরাও আগে ভাবতে পারেননি। মরুকরণ কমানো, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থামানো এবং মৃতপ্রায় ভূমিকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যেই দেশটি অসংখ্য গাছ লাগিয়েছে এবং নষ্ট তৃণভূমিকে পুনর্গঠন করেছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, এই সব প্রচেষ্টা চীনের ভেতরে পানির গতিপথকে বিস্ময়করভাবে বদলে দিয়েছে।পানির প্রাপ্যতা বদলে গেছে দেশের চুয়াত্তর শতাংশ এলাকায়।

দুই দশকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০০১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে চীনের পূর্বাঞ্চলীয় মৌসুমি অঞ্চল ও উত্তর–পশ্চিমের শুষ্ক অঞ্চলে গাছপালা বাড়লেও মানুষ ও বাস্তুতন্ত্রের জন্য ব্যবহারযোগ্য মিঠা পানির পরিমাণ কমে গেছে। এই দুই অঞ্চল মিলে চীনের প্রায় তিন–চতুর্থাংশ ভূমি গঠিত।

গবেষকদের পর্যবেক্ষণে আরও জানা যায় যে একই সময়ে তিব্বতি মালভূমিতে পানির প্রাপ্যতা বরং বেড়েছে।

গবেষণার সহলেখক উটরেখ্‌ট ইউনিভার্সিটির গবেষক আরিয়ে স্টাল ব্যাখ্যা করেন যে ভূমির আচ্ছাদন বদলালে পানি নতুনভাবে বণ্টিত হতে থাকে। চীন গত কয়েক দশকে ব্যাপক মাত্রায় পুনঃবনায়ন করেছে। বিশেষ করে লোয়েস মালভূমিতে তারা সক্রিয়ভাবে বাস্তুতন্ত্র পুনর্গঠনের কাজ করেছে, যা দেশের জলচক্রকে আরও শক্তিশালী করেছে।

জলচক্র কীভাবে উদ্ভিদের কারণে বদলায়, তা বুঝতে ভূমি থেকে পানি বায়ুমণ্ডলে ওঠার পথগুলো জানা প্রয়োজন। প্রথম পথ হলো ইভাপোরেশন যেখানে মাটি বা ভূমির ওপরের পানি বাষ্প হয়ে আকাশে উঠে যায়। দ্বিতীয় পথ ট্রান্সপিরেশন যেখানে উদ্ভিদ মাটি থেকে পানি টেনে নিয়ে পাতা দিয়ে বাতাসে পাঠায়।

তৃতীয় পথ প্রিসিপিটেশন যার মাধ্যমে মেঘে জমা পানি আবার বৃষ্টি হয়ে ভূমিতে নামে। ইভাপোরেশন ও ট্রান্সপিরেশন মিলেই ইভাপোট্রান্সপিরেশন হয়, এবং এটি নির্ভর করে ভূমিতে কত পরিমাণ উদ্ভিদ আছে তার ওপর। স্টাল জানান, ঘাসভূমি ও বন উভয়ই ইভোপোট্রান্সপিরেশন বাড়ায়, তবে বন বাড়লে এর প্রভাব আরও তীব্র হয়, কারণ গাছের শেকড় সাধারণত গভীর পর্যন্ত যায় এবং শুষ্ক মৌসুমেও তারা গভীর থেকে পানি টেনে বাতাসে পাঠাতে সক্ষম।

চীনের সবচেয়ে বড় সবুজায়ন কর্মসূচির নাম গ্রেট গ্রিন ওয়াল, যা ১৯৭৮ সালে শুরু হয়েছিল মরুভূমির বিস্তার ঠেকাতে। তখন চীনের মাত্র দশ শতাংশ ভূমি বনাঞ্চল ছিল, আর এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে পঁচিশ শতাংশে। যার আয়তন প্রায় পুরো আলজেরিয়া দেশের সমান। গত বছর তারা ঘোষণা করেছে যে দেশের সবচেয়ে বড় মরুভূমিকে সম্পূর্ণভাবে বৃক্ষরোপণ করে ঘিরে ফেলা হয়েছে।

এর পাশাপাশি গ্রেইন ফর গ্রিন প্রোগ্রাম নামের আরেক প্রকল্প ১৯৯৯ সালে চালু হয়, যা কৃষকদের চাষের জমিকে বন বা ঘাসভূমিতে রূপান্তর করতে উৎসাহিত করেছে। একই বছর শুরু হওয়া ন্যাচারাল ফরেস্ট প্রোটেকশন প্রোগ্রাম প্রধান বনাঞ্চলে কাঠ কাটা নিষিদ্ধ করে এবং পুনঃবনায়নের কাজ আরও বাড়ায়। এসব উদ্যোগ মিলিয়ে ২০০০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত পৃথিবীতে যত নতুন পাতা জন্মেছে তার এক চতুর্থাংশ এসেছে শুধু চীন থেকেই।

তবে এত সবুজ ফিরে পাওয়াই যে সর্বত্র পানি বাড়ার নিশ্চয়তা দেয়, তা নয়। গবেষণায় দেখা গেছে গাছপালা বাড়লে ইভাপোট্রান্সপিরেশনও বাড়ে, ফলে বাতাসে পানির পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, কিন্তু সেই পানি সব জায়গায় বৃষ্টি হয়ে নামে না।

বাতাস অনেক সময় সাত হাজার কিলোমিটার দূর পর্যন্ত পানি বহন করতে পারে। তাই পূর্বাঞ্চল ও উত্তর–পশ্চিমে পানি কমেছে, আর তিব্বতি মালভূমিতে বৃষ্টি বেড়েছে। স্টাল বলেন, জলচক্র আগের চেয়ে আরও সক্রিয় হলেও দেশের কয়েকটি অঞ্চলে আগের তুলনায় বেশি পানি হারিয়ে যাচ্ছে।

চীন এমনিতেই গুরুতর পানি বৈষম্যের সমস্যায় ভুগছে। দেশের মাত্র বিশ শতাংশ পানি উত্তরাঞ্চলে পাওয়া যায়, অথচ এখানেই বসবাস করে প্রায় ছেচল্লিশ শতাংশ মানুষ এবং রয়েছে চাষাবাদের ষাট শতাংশ জমি। সরকার বহু বড় জলবণ্টন প্রকল্প চালাচ্ছে, কিন্তু গবেষকদের মতে, সবুজায়নের কারণে পানি কোথায় কমছে আর কোথায় বাড়ছে তা না বুঝলে এসব প্রকল্প ব্যর্থ হতে পারে।

বিশ্বের বহু দেশই এখন বাঁশবন, তৃণভূমি বা বন ফিরিয়ে আনার কাজ করছে। স্টাল মনে করেন যে, প্রতিটি এলাকাকে আলাদা করে গবেষণা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে সেখানে গাছ লাগালে আদৌ পানি বাড়বে নাকি বরং কমে যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, যে পানি গাছপালা বাতাসে তুলছে তা আবার কোথায় গিয়ে বৃষ্টির আকারে জমা হচ্ছে।

-- অরণ্যের অভিযাত্রী

Author: Saikat Bhattacharya


You may also like