মহাবিশ্বের সমাপ্তি থেকেই জন্ম নেয় আরেকটা নতুন মহাবিশ্ব

24-June-2026 by east is rising 1

কনফর্মাল সাইক্লিক কসমোলজি

ধরুন, আপনাকে বলা হলো মহাবিশ্বের কোনো শুরু নেই।না, এটা কোনো বিশ্বাস নয়। এটা একজন নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানীর গাণিতিক প্রস্তাবনা। তিনি বলছেন, আমরা যে বিগ ব্যাংকে "সবকিছুর শুরু" বলে জানি সেটা আসলে শুরু নয়। সেটা হতে পারেএকটা পুনরাবৃত্তি।

পরিচিত গল্পটা প্রথমে বলি আমরা সবাই জানি প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে, একটি বিন্দু থেকে বিস্ফোরিত হয়েছিল আমাদের মহাবিশ্ব। এটাই বিগ ব্যাং। স্কুলের বইতে, ডকুমেন্টারিতে, সব জায়গায় এই গল্পটাই বলা হয়।

কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো বিগ ব্যাংয়ের আগে কী ছিল? এই প্রশ্নটা শুনতে সহজ। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে এই একটা প্রশ্ন বহু বিজ্ঞানীর ঘুম কেড়ে নিয়েছে। পেনরোজের সাহসী প্রস্তাব। এই প্রশ্নের একটা অপ্রচলিত উত্তর দিয়েছিলেন নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী রজার পেনরোজ।

তার তত্ত্বের নাম Conformal Cyclic Cosmology, সংক্ষেপে CCC। তিনি বললেন, বিগ ব্যাং মহাবিশ্বের একদম শুরুর বিন্দু নয়। এটা হতে পারে একটা নতুন মহাজাগতিক অধ্যায়ের সূচনামাত্র। মানে আগেও কিছু একটা ছিল। আর সেটাই শেষ হয়ে জন্ম দিয়েছে আমাদের এই মহাবিশ্বকে।

শুনতে অবিশ্বাস্য লাগছে? আসল ধাঁধাটা এখনো শুরুই হয়নি। শেষ কীভাবে শুরু হয়ে যায়? মহাবিশ্ব প্রতি মুহূর্তে প্রসারিত হচ্ছে। দূরের গ্যালাক্সিগুলো একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত, প্রতিক্ষণ। কোটি কোটি বছর পর কী হবে?

একে একে নিভে যাবে নক্ষত্ররা। গ্যালাক্সিগুলো ছড়িয়ে পড়বে অসীম শূন্যতায়। মহাবিশ্ব হয়ে উঠবে এমন ঠান্ডা, এমন ফাঁকা, যে সেখানে আর কোনো জটিল কাঠামো কোনো গ্রহ, কোনো নক্ষত্র, কোনো জীবন অবশিষ্ট থাকবে না। এটাকেই বলা হয় মহাবিশ্বের তাপীয় মৃত্যু।

কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো পেনরোজ এই চূড়ান্ত মৃত্যুর মধ্যে কী দেখলেন? তিনি দেখলেন এই চরম শেষ অবস্থা আর একটা নতুন বিগ ব্যাংয়ের ঠিক পরের অবস্থা। এই দুটোর মধ্যে আছে এক আশ্চর্য গাণিতিক মিল।

তার মানে কী? মহাবিশ্বের "শেষ" আর পরের মহাবিশ্বের শুরু গণিতের ভাষায় এই দুটো আসলে একই বিন্দু হতে পারে। মৃত্যু আর জন্ম, এক জায়গায় মিশে যাচ্ছে।

এয়ন। সময়ের এক একটা অধ্যায়। পেনরোজ মহাবিশ্বের প্রতিটি বিশাল যুগকে নাম দিয়েছেন Aeon।

একটা এয়ন শুরু হয় বিগ ব্যাং দিয়ে। তারপর একে একে জন্ম নেয় গ্যালাক্সি, নক্ষত্র, গ্রহ। হয়তো কোথাও জন্ম নেয় জীবনও আমাদের মতোই কৌতূহলী কোনো সত্তা যে আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজের অস্তিত্বের উৎস খুঁজছে। মহাবিশ্ব প্রসারিত হতেই থাকে। অবশেষে সেই এয়ন তার শেষ সীমায় পৌঁছায়।

কিন্তু সেই শেষটাই শেষ কথা নয়। সেই সমাপ্তি থেকেই জন্ম নেয় আরেকটা নতুন এয়ন যেটা আমাদের কাছে দেখা দেয় সম্পূর্ণ নতুন একটা বিগ ব্যাং হিসেবে। একটা এয়নের শেষ, আরেকটা এয়নের শুরু। চক্রের পর চক্র। অনন্তকাল ধরে। তাহলে মহাবিশ্বের কি কোনো শুরুই নেই?

একটা বৃত্তের কোথায় শুরু, কোথায় শেষ বলতে পারবেন? CCC বলছে, মহাবিশ্বও হয়তো ঠিক তেমনই। কোনো একক "প্রথম মুহূর্ত" হয়তো কখনোই ছিল না। একটা মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ হয়ে যায় আরেকটা মহাবিশ্বের অতীত। অসীম এক শৃঙ্খলে আমরা হয়তো শুধু একটা মাত্র লিংক।

পেনরোজ নিজেই দাবি করেছিলেন, মহাজাগতিক মাইক্রোওয়েভ পটভূমি বিকিরণে যাকে আমরা বলি CMB, পুরো আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা মহাবিশ্বের আদিমতম আলোর ছাপ সেখানে নাকি কিছু বিশেষ বৃত্তাকার নিদর্শন পাওয়া যায়।

তার দাবি ছিল, এই বৃত্তগুলো হতে পারে আগের এয়নের শেষ মুহূর্তের চিহ্ন যেন আগের মহাবিশ্বের একটা স্বাক্ষর, যা এখনো আমাদের আকাশে লুকিয়ে আছে।

রোমাঞ্চকর শোনাচ্ছে তাই না? কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো: "বিজ্ঞানী মহল কি এটা মেনে নিয়েছে?: উত্তরটা হলো: "না, এখনো নয়।" অধিকাংশ গবেষক এই বৃত্তাকার নিদর্শনগুলোকে নিশ্চিত প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করেননি। গভীর বিশ্লেষণে বহুবার দেখা গেছে, এই প্যাটার্নগুলো নিছক পরিসংখ্যানগত কাকতালীয় ঘটনাও হতে পারে।

তাহলে বিজ্ঞান কী বলছে? CCC একটা গাণিতিকভাবে অত্যন্ত পরিশীলিত ও কল্পনাপ্রবণ তত্ত্ব। কিন্তু এটা এখনো মূলধারার মহাকাশবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত সত্য নয়।

বর্তমানে বিজ্ঞানীরা একমত যে, বিগ ব্যাং তত্ত্ব মহাবিশ্বের প্রাথমিক বিবর্তন দারুণভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে। কিন্তু বিগ ব্যাংয়ের আগে আসলে কী ছিল সেই প্রশ্নের চূড়ান্ত, সর্বসম্মত উত্তর আজও কারো কাছে নেই। এই CCC সেই সম্ভাব্য উত্তরগুলোর একটা মাত্র। হয়তো সঠিক। হয়তো নয়।

আসলে আমরা হয়তো ভাবি, আমরা সময়ের একদম শুরুতে দাঁড়িয়ে আছি দেখার জন্য যে মহাবিশ্ব কীভাবে শুরু হলো। কিন্তু পেনরোজের তত্ত্ব যদি সত্যি হয়, তাহলে আমরা আসলে দাঁড়িয়ে আছি এক অসীম চক্রের মাঝখানে। না কোনো শুরু, না কোনো শেষ। শুধু এক অধ্যায় থেকে আরেক অধ্যায়ে চিরন্তন রূপান্তর।

আমাদের মহাবিশ্বের আগে হয়তো ছিল আরেকটা মহাবিশ্ব। আর আমাদের মহাবিশ্বের ছাইভস্ম থেকেই হয়তো জন্ম নেবে আরেকটা নতুন জগৎ নতুন নক্ষত্র, নতুন গ্রহ, হয়তো নতুন কোনো সত্তা, যে আবার আকাশের দিকে তাকিয়ে একই প্রশ্ন করবে।

প্রশ্ন একটাই থেকে যায়: "আমরা কি এখনো আমাদের আগের মহাবিশ্বের কোনো চিহ্ন বহন করে চলেছি, নাকি সেই ইতিহাস চিরতরে হারিয়ে গেছে মহাজাগতিক অন্ধকারে?"

Author: Saikat Bhattacharya


You may also like