কম্পিলড টু সিক শেল্টার “ এই একটি শব্দ আজ বহু হিন্দু উদ্বাস্তুকে চিরকালের জন্য বে নাগরিক করে দিচ্ছে। আজকাল রাজ্যের বর্ডার এলাকার বেশ কিছু এলাকায় রীতিমত ক্যাম্প করে করে তথাকথিত সিএএ ২০১৯ এর পোর্টালে আবেদন করাচ্ছেন বিজেপির নেতারা। সঙ্গে বেশ কয়েকজন হিন্দুত্ববাদী উচ্চ শিক্ষিত ও সরকারি আমলাও থাকছেন। বলতে দ্বিধা নেই, যেহেতু এ বিষয়ের রাজ্যের সবচেয়ে বেশি বিরোধী বলে পরিচিত, রাজ্যের তৃণমূল সরকার ও দামাল বাংলা নামে একটি সংগঠন, এবং এরা বিষয়টি নিয়ে কিছুদিন নির্লিপ্ত হয়ে আছে, তার ফলে এটারই সুযোগ নিয়ে “ ছেলেধরার দল “ বেরিয়ে পড়েছে “ দেশ ভাগের বলি, “ অখণ্ড ভারতের ভূমি সন্তানদের চিরকালের জন্য রাষ্ট্রহীন বে- নাগরিক করার কাজে। আমরা জানি ২০১৯ সালের নাগরিকত্ব আইনে স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে, আইনটিতে উল্লিখিত তিনটি দেশের ছয়টি ধর্মের মানুষ, যাঁরা পাসপোর্ট অ্যাক্ট ও ফরেন অ্যাক্টে ছাড় পেয়েছেন তারা আর ইললিগ্যাল মাইগ্রেন্ট নন। অর্থাৎ অবৈধ অভিবাসী নন।
ফলত বিজেপি সমর্থকদের ধারণা হয়েছে, যেহেতু ইললিগ্যাল নন কথাটা লেখা আছে, ফলত অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হয়ে থাকা মানুষ গুলো লিগ্যাল বা বৈধ হয়ে গেছেন। কিন্তু বিপত্তিটা হচ্ছে, সিএএ ১৯ এর শর্ত নিয়ে। আইনটির মূল শর্ত গুলোর প্রধান দুটি শর্ত হচ্ছে, পাসপোর্ট অ্যাক্ট ১৯২০ ও ১৯৪৬ সালের বৈদেশিক আইনে ছাড় পেতে হবে।
বলতে দ্বিধা নেই, এই কথাটি এতদিন বিজেপি কর্মী - সমর্থক ও নেতারা প্রকাশ করতেন না। কিন্তু এখন তারা প্রচার করছেন, খুবই জোরের সঙ্গে। আর এটাই বুঝি তাদের লোক ঠকানোর মূল মন্ত্র। তারা বেশ কয়েকজন উকিল ও তাদের সমাজের প্রতিষ্ঠিত ও উচ্চশিক্ষিত মানুষদের সঙ্গে নিয়ে বলছেন,
২০১৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর দেশের সরকার পাসপোর্ট অ্যাক্ট ও বৈদেশিক আইনে ছাড় দিয়ে দিয়েছে। বলছেন,সেখানে লেখা আছে ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে নির্দিষ্ট তিনটি দেশের ছয়টি ধর্মের মানুষ যারা ধর্মীয় কারণে বা ধর্মীয় নির্যাতনের ভয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে বা আশ্রয় চাইতে বাধ্য হয়েছে তাদের জন্যই দেশের হিন্দু হৃদয় সম্রাট প্রধান মন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর মোদী সব কিছুতে ছাড় দিয়ে দিয়েছেন। অর্থাৎ পাসপোর্ট - ভিসা ছাড়া অবৈধ পথে কাঁটাতার পেরিয়ে ভারতে এলেও তারা নাগরিকত্ব পাবে। অর্থাৎ সিএএ পোর্টালে আবেদন করতে পারবেন।
আর এ কথাটাই বলছেন উদ্বাস্তু ও দলিত নেতা বিখ্যাত সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাস মহাশয়ও। সুতরাং “ দুয়ে দুয়ে চার “ হয়ে গেলো।
মোটকথা আর কোনো সন্দেহের অবকাশই বুঝি রইলনা উদ্বাস্তু হিন্দুদের। বলতে দ্বিধা নেই, আজকের তারিখেও সুকৃতি বাবু দ্ব্যর্থহীন ভাবে বলছেন ২০১৪ সালের আগে আসা হিন্দু উদ্বাস্তুদের অনুপ্রবেশকারী তকমা মোচন হয়ে গেছে। ফলত রাজ্যের উদ্বাস্তু মানুষরা গত কয়েক বছর ধরে নাগরিকত্ব আদায়ের জন্য কোনো আন্দোলনই করেন নি। এমনকি দল বেঁধে তারা বিজেপি সমর্থক হয়ে গেছেন। কারণ, তাদের ধারণা হয়েছিল তারা বুঝিবা বৈধ শরণার্থী হয়ে গেছেন ভারতে। - এবার নিশ্চয় বিজেপি সরকার তাঁদের নাগরিকত্ব দিয়ে দেবে।
কিন্তু এই কথা গুলো যে সম্পূর্ণ ভুল, এমনকি সি এ এ ২০১৯ এর মাধ্যমে যারা নাগরিকত্বের সার্টিফিকেট পেয়েছেন তাদের নাগরিকত্ব গুলোও যে বাতিল হয়ে যেতে পারে সে কথা আজ মেনে নিলেন সি এ এ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা তাপস কান্তি বিশ্বাস ও। কারণ তিনি সি এ এ বিরোধী হলেও “ দামাল বাংলার ব্যাখ্যার সঙ্গে তার ব্যাখ্যার কিছুটা অমিল ছিল।
আসলে “ ২০১৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত পাসপোর্ট অ্যাক্টের রুল ও ফরেনার্স অ্যাক্টের অর্ডারে উল্লিখিত একটি ইংরেজি শব্দের ব্যাখ্যা বহু উদ্বাস্তুকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিয়েছে। আর এ কথা গুলো আমরা বারবার বুঝিয়েও বিজেপি বিধায়ক অসীম সরকার ও নিখিল ভারত বাঙালি সমন্বয় সমিতির প্রধান ডাক্তার সুবোধ বিশ্বাসকে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত করতে পারিনি। অবশ্য এক্ষেত্রে আমি আমার বিশেষ পরিচিত ও বন্ধু এই দুজনকেই পুরোপুরি দোষ দিই কি করে! এর জন্য আসল দায়ী তো ইন্টারনেট ও গুগল।
কারণ ওই যে “ কম্পিল টু সিক শেল্টার “ কথাটা ! বিজেপি নেতা ও বিজেপি পন্থী উদ্বাস্তু নেতারা CAA ক্যাম্পে দাঁড়িয়ে আমার বিরুদ্ধে কিছু কথা বলার পর বলছেন, আপনারা গুগল সার্চ করে পাসপোর্ট অ্যাক্টটা একবার দেখে নেবেন। সেখানে বলা আছে “ যাঁরা আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে, তাদের পাসপোর্ট ও ভিসা লাগবে না। এমনকি কাঁটা তার পেরিয়ে পেরিয়ে ভারতে এলেও তারা ভারতের নাগরিকত্ব পাবেন, এমনকি বহু লোক পাচ্ছেন ও বটে। এই বলে তারা কিছু উদাহরণ দিচ্ছেন, যেমন তারা বলছেন, চুপি চুপি বেশ কয়েকজন তৃণমূল পার্টির বিধায়ক, কয়েকজন উকিল, এমনকি দু একজন জজ সাহেবরাও সি এ এ পোর্টালে আবেদন করছেন। তবে আবেদনকারীদের নাম বলছেন না বিজেপি নেতারা।
নাম বলছেন না, কিন্তু যারা সার্টিফিকেট পাচ্ছেন, তাদের সেই ভুয়ো সার্টিফিকেট গুলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন তারা উদ্বাস্তু হিন্দুদের আকর্ষণ করার জন্য।
বাস্তবে “ seek “ মানে চাওয়া , একথাটা প্রায় সকলেই জানেন। কিন্তু কেউ যখন গুগুলে “ কম্পিল টু সিক শেল্টার “ কথাটার অর্থ জানতে চাইছে, তখনই গুগল বলছে,কথাটির অর্থ হচ্ছে, “ আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছি। “ ব্যস এখানেই বাজিমাত করে দিচ্ছে বিজেপি নেতারা। কিন্তু বাস্তবে “ কম্পিল টু সিক শেল্টার “ কথাটা যখন ব্যক্তিগত কারণে বা ব্যক্তিগত অ্যাপিল বোঝায় সে ক্ষেত্রে অর্থ দাঁড়ায় “ আশ্রয় নিতে বাধ্য হওয়া। “ কিন্তু এই কথাটা যখন ফরমাল ও লিগ্যাল বিষয়ে ব্যবহার হয় তখন সেটির অর্থ দাঁড়াচ্ছে,
“ আশ্রয় চাইতে বাধ্য হওয়া “
ফলে চাওয়া আর নেওয়া, এই দুটো শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে থাকছে বাঙালি সমাজের এক বিরাট অংশের মানুষের জীবন। দামাল বাংলার ব্যাখ্যা হচ্ছে, “ আশ্রয় চাওয়া “ অর্থাৎ “ যাঁরা আশ্রয় চেয়েছেন। “
আর একারণেই গত ২০২৩ এর ১৮ ডিসেম্বর মিনিস্ট্রি অফ হোম এর ওয়েবসাইটে একটি ১১ পাতার ঘোষণা দিয়েছে দেশের স্বরাষ্ট্র দপ্তর। তবে খুবই সন্তর্পনে। ঘোষণাটি হচ্ছে “ লং টার্ম ভিসা “ পাবার আবেদন। সেটির ৮ থেকে ১১ নম্বর পাতাটি হচ্ছে, সি এ এ ২০১৯ অনুসারেই। সেখানে তথাকথিত CAA১৯ টা বসানো আছে হুবহু।
বাস্তবে “ লং টার্ম ভিসা “ বা এলটিভি পাবার বিষয়টা অনেক আগে থেকেই আছে আমাদের দেশে। LTV পাবার সুযোগের ক্ষেত্রে আগে ছিল পাকিস্থান ও আফগানিস্তানের নাম। পরে সম্ভবত ২০২৩ সালে বাংলাদেশ কথাটাও যুক্ত করা হয়। মোট কথা উদ্বাস্তু হিন্দুদের মধ্যে তারাই সি এ এ তে আবেদনের যোগ্য হবেন যারা LTV নিয়মকানুন এর ৮ নম্বর থেকে ১১ নম্বর ভালো করে বুঝে আবেদন করবেন এবং সরকারের কাছে আশ্রয় চাইবেন তারাই। সরকারের ফরেন রেজিস্ট্রেশন অফিসার এই আবেদন মঞ্জুর করেন আবেদনটি পরীক্ষা নিরীক্ষার পরে। তারপর তিনি একটি সার্টিফিকেট দেন। বাস্তবে সেই সার্টিফিকেটটি যুক্ত করতে হয় সিএএ আবেদনের সঙ্গে । আর এটাই আমরা দেখতে পাবো তথাকথিত সি এ এ এর একদম শেষের দিকে। সেখানে আবেদনকারীকে স্বীকারোক্তি দিতে হয় এই বলে যে, তিনি অমুক দিন পাসপোর্ট অ্যাক্ট ও ফরেন অ্যাক্টে ছাড় পেয়েছেন। বাস্তবে হয়তো বাংলার কোনো অবৈধ অভিবাসীই ছাড় পাননি। কারণ তারা হয়তো কেউই বিষয়টা জানেন না। ফলত নাগরিকত্ব পাবার লোভে তারা বিজেপি বিধায়ক অসীম সরকার ও দলিত নেতা সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাসদের বিশ্বাস করে সি এ এ পোর্টালে স্বীকারোক্তি করে ফেলছেন “ পাসপোর্ট অ্যাক্ট ও ফরেনার্স অ্যাক্টে ছাড় পেয়েছেন ভেবে। যা সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং আবেদনকারীর জীবনের পক্ষে ভয়াবহ। এমন কি বাঙালি সমাজের পক্ষেও মারাত্মক!
মানিক ফকির / Manik Mondal
দামাল বাংলা
9836327536
10/10/2025
Author: মানিক ফকির