বাঙ্গু বাম্বাচ্চারা সর্বদা 'নারী স্বাধীনতা' ও 'সমকাম স্বাধীনতা' বলে চিৎকার করে বেড়ায়। তাদের মতে—“এগুলো খুবই 'বৈজ্ঞানিক' 'প্রগতিশীলতা' ও 'উন্নতির মানদণ্ড', এগুলোকে যারা মানে না তারা নাকি 'বিজ্ঞানবিরোধী' ও 'পশ্চাৎপদ'।”
পৃথিবীর সেরা উন্নত দেশগুলোর মধ্যে চীন অন্যতম অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতাশালী দেশ। চীন সেইসাথে বাম্বাচ্চাদের তীর্থস্থানও। সেই চীনের দুটো বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো:
১. নারীবাদ ও নারী স্বাধীনতা
২. সমকাম স্বাধীনতা
১. চীনের নারীবাদ ও নারী স্বাধীনতা:
 ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄
পর্যবেক্ষকদের মতে, শি জিনপিং-এর প্রশাসন ২০১২ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে চীনে নারীর অধিকার (মূলত নারীবাদ) পশ্চাৎমুখী হয়েছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের লিঙ্গ বৈষম্য সূচকে ২০১২ সালে চীন ছিল ৬৯তম, আর ২০২৪ সালে নেমে গেছে ১০৬তম স্থানে। একই সময়ে মন্ত্রী পর্যায়ে নারীর প্রতিনিধিত্ব কমে দাঁড়িয়েছে ৪.৩%-এ, ২০২২ সালে, ২০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো, চীনা কমিউনিস্ট পার্টি (CCP)-র পলিটব্যুরোতে কোনো নারী সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।¹
পর্যবেক্ষকদের মতে, কমিউনিস্ট পার্টি সরকারি পদে নারীর ভূমিকা হ্রাস করছে। শি জিনপিং বহুবার ঐতিহ্যবাহী পরিবার ও নারীত্বের গুণাবলির কথা উল্লেখ করেছেন। ২০১৬ সালে তিনি 'স্ত্রীর গুণ' ও 'মাতৃসুলভ মমতা'কে চীনা নারীদের জন্য আদর্শ গুণ হিসেবে বর্ণনা করেন। ২০১৯ সালে শি বলেন, পারিবারিক মূল্যবোধ রক্ষায় নারীদের একটি অনন্য ভূমিকা রয়েছে। আর ২০২১ সালের আন্তর্জাতিক নারী দিবসে শি 'মাতৃত্ব'কে মহিমান্বিত করেন।²
২০২১ সালে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিসি) নারীত্বের ঐতিহ্যবাহী আদর্শকে পুনরুজ্জীবিত ও প্রচার করার এবং আরও কঠোর পুরুষতান্ত্রিক আদর্শকে প্রচার করার জন্য নতুন করে প্রচেষ্টা শুরু করে।³ শি জিনপিং ২০২৩ সালে নারীদের জন্য বলেছেন, যে নারীদের উচিত বাড়িতে থাকা এবং বাচ্চা পালন করা। এছাড়া সম্প্রতি ডিভোর্স ল-তেও পরিবর্তন এসেছে। স্ত্রী অর্ধেক সম্পত্তি আর পাবেনা।
শি জিনপিংয়ের অধীনে , প্রশাসন বহু নারীবাদী এনজিও বন্ধ করে দেয় এবং নারীবাদী প্ল্যাটফর্মগুলিকে সেন্সর করে। প্রশাসন নারীবাদকে একটি বিষাক্ত পশ্চিমা মতাদর্শ হিসেবে দেখে।⁴
২০২২ সালে, চীনের কমিউনিস্ট ইয়ুথ লীগ ঘোষণা করে যে, 'চরম নারীবাদ ইন্টারনেটে একটি বিষাক্ত টিউমারে পরিণত হয়েছে।'⁵
এজন্যই চীন প্রশাসন অনেক অনলাইন ফোরামের নারী-অধিকারভিত্তিক গ্রুপগুলোকে 'সামাজিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী' বলে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের অধীনে নারীবাদী সক্রিয়তার উপর কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। 'নারীবাদ' এবং 'মিটু'-র মতো শব্দগুলিকে অনলাইন সেন্সরশিপের আওতায় আনা হয়। এবিষয়ে চীনা নারীবাদী লি মাইজিও এবিসিকে বলেন—“It made me extinct on Weibo, which is terrifying, and I was named by Weibo, saying that I was inciting hatred.”⁶
২০২১ সালের এপ্রিল মাসে দশটি নারীবাদী ফোরাম বন্ধ করে দিয়েছে, কারণ প্রশাসন মনে করে 'নারী-কেন্দ্রিক সংস্কৃতি' চীনের পুরুষ-শাসিত ব্যবস্থার জন্য একটি হুমকি।⁷
সাংগঠনিকভাবে নারীবাদী কাজকর্ম চীনে প্রায় অসম্ভব, কারণ ২০১৫ সালে, আন্তর্জাতিক নারী দিবসের আগে পাঁচজন নারী রেল ও বাসে লিঙ্গভিত্তিক হেনস্থার বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইনের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন মাত্র আর তাতেই প্রশাসন তাদেরকে 'ঝগড়া উস্কে দেওয়া'র অভিযোগে গ্রেপ্তার করে।⁸
মিটু আন্দোলনের জন্য নারীকর্মী Huang Xueqin-কে ২০২৪ সালে 'state subversion'-এর অভিযোগে ৫ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এজন্যই চীনা নারীবাদীরা অনলাইন ফেমিনিজমে ঝুঁকছে কিন্তু অনলাইন ফেমিনিজমকেও চীনা প্রশাসন কঠোরভাবে দমিয়ে দেয়। সোশ্যালে হ্যাশট্যাগ # MeToo দ্রুত সেন্সর হয়ে যায়। Feminist Voices-এর মত একাধিক প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করে দেওয়া হয়।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর গবেষণা অনুযায়ী, চীনে সরকারি ও বেসরকারি চাকরির বিজ্ঞাপনে প্রকাশ্যে নারীদের প্রতি বৈষম্য করা হয়। গত পাঁচ বছরে প্রকাশিত ৩৬,০০০ চাকরির বিজ্ঞাপন বিশ্লেষণ করে তারা দেখতে পায়, এসব বিজ্ঞাপনে নিয়মিতভাবে পুরুষ প্রার্থীদের প্রতি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
টেক জায়ান্ট আলিবাবা এবং বাইডুও এমন বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেছিল যেখানে নারীদের আবেদন করার কোন সুযোগই রাখা হয়নি।
Human Rights Watch-এর ২০১৮-র একটি রিপোর্ট মতে: ২০১৭ সালে সরকারি চাকরির প্রায় ১৩ % বিজ্ঞাপনে লেখা ছিল 'পুরুষ প্রযোজ্য', ২০১৮ সালে এই সংখ্যা বেড়ে ১৯%।⁹
একটা রিপোর্টে দেখা যায়, চীনের ১৯৫টি পেশাদার ই-স্পোর্টস ক্লাবের ৯০ শতাংশেরও বেশি শুধুমাত্র পুরুষদের জন্য।
২. চীনে সমকাম স্বাধীনতা
 ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄
২০১২ সালের নভেম্বরে শি জিনপিং ক্ষমতায় আসার পর থেকে চীনে সাংস্কৃতিক সেন্সরশিপ বৃদ্ধি করা হয়েছে । চীনা কমিউনিস্ট পার্টি LGBTQ সমর্থনকে বিদেশী শক্তির হুমকি হিসাবে বিবেচনা করে। ২০১৬, ২০১৯, ২০২২ এবং ২০২৫ সালে, চীন জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে যৌন অভিমুখীতা এবং লিঙ্গ পরিচয় সংক্রান্ত জাতিসংঘের স্বাধীন বিশেষজ্ঞের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিল ।¹⁰
শি জিনপিংয়ের প্রশাসন LGBTQ স্থান এবং অনুষ্ঠানগুলি বন্ধ করতে বাধ্য করেছে এবং LGBTQ অধিকার কর্মীরা দেশের গণ নজরদারি ব্যবস্থার দ্বারা আরও বেশি তদন্তের শিকার হয়েছে।
Boy's Love লেখকদের নিয়মিতভাবে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ফৌজদারি মামলা করা হয়।¹¹
২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে 'মামা রেইনবো' নামক সমকামী তথ্যচিত্র সমস্ত চীনা ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। ২০১৬ সালে প্রশাসন জনপ্রিয় নাটক, 'অ্যাডিক্টেড'-কে চীনা ওয়েবসাইটগুলিতে নিষিদ্ধ করে। সরকারের মতে, এই অনুষ্ঠানটি নতুন নির্দেশিকা লঙ্ঘন করেছে, যেখানে বলা হয়েছে যে, “কোনও টেলিভিশন নাটকে অস্বাভাবিক যৌন সম্পর্ক এবং আচরণ দেখানো যাবে না, যেমন অজাচার, সমকামী সম্পর্ক, যৌন বিকৃতি ইত্যাদি।”
তাহলে দেখা যাচ্ছে বাম্বাচ্চারা যেগুলোকে 'প্রগতিশীলতা' 'বৈজ্ঞানিক' 'উন্নতির মানদণ্ড' ইত্যাদি বলে প্রচার করছে দেখা যাচ্ছে তাদেরই তীর্থস্থানে সেগুলোকে কঠোরভাবে দমন করা হচ্ছে। তাতে কি তারা পিছিয়ে পড়েছে? বৈজ্ঞানিক গবেষণা থেমে গেছে?— মোটেওনা,বরং তাদের অবস্থা পৃথিবীর সেরা উন্নত দেশের তালিকায়। আর উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে।
_____________
বিজ্ঞানসুত্র:
১.International Women's Day: 30 years of the Beijing Declaration, and Beijing’s Betrayal, March 07, 2025, Kris Li
২.Women’s voices, rights, and the vision of the state, Pan Wang, Chapter 5.
৩.Women’s voices, rights, and the vision of the state, Pan Wang, Chapter 5
৪.Lu, Shen. "Under Xi Jinping, Women in China Have Given Up Gains". The Wall Street Journal. Retrieved 10 November 2022.
৫.Chen, Yifan; Gong, Qian (23 January 2023). "Unpacking 'baby man' in Chinese social media: a feminist critical discourse analysis". Critical Discourse Studies. 21 (4): 400–417.
৬.China is repressing the feminist movement, but women's voices are only getting louder
By Samuel Yang for China Tonight
৭.Women’s voices, rights, and the vision of the state, Pan Wang, Chapter 5.
৮.Chinese International Women’s Day activist: ‘Feminism is a way of life’, 6 March 2025, Amnesty International.
৯.China: Job Ads Discriminate Against Women,April 23, 2018.
১০.UN votes to renew LGBTQ+ expert’s mandate just after the US withdrew from Human Rights Council, Alex Bollinger
July 8, 2025
১১.Wang, Vivian (28 June 2025). "Chinese Police Detain Dozens of Writers Over Gay Erotic Online Novels". The New York Times.
সৈকত ভট্টাচার্য বলছেন এর সাথে মাথায় রাখতে হবে যে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি মনে করে উন্নয়ন হলে নারী শ্রম বাজারে যুক্ত হলে নারী ও পুরুষের উভয়েরই অর্থনৈতিক বিকাশ হয়। কিন্তু নারী আর আগের মতো স্বামীর ওপর অর্থনৈতিক ভাবে নির্ভরশীল থাকেনা বলে নারীর যোউন স্বাধীনতাও বেড়ে যায়। ফলে যৌনতার বাজারে পুরুষের দর কষাকষির ক্ষমতা কমে আর নারীর বাড়ে। নারী মূলত শ্রেষ্ঠ পুরুষদের (রূপে ও অর্থে) দিকে আকর্ষিত হয় এবং শ্রেষ্ঠ পুরুষদের না পেলে নীম্ন পুরুষদের (রূপে ও অর্থে) দিকে যায়না। ফলে একদিকে আর্থিক ভাবে শক্তিশালি ও রূপবান সামান্য অংশের কিছু পুরুষদের থাকে নারীর আধিক্য আর অধিকাংশ সাধারণ পুরুষের নারী জোটেনা। এর ফলে সাধারণ পুরুষ নারী পেতে তোয়াজ (simping) করা শুরু করে এবং তাদের কাছে নারি পাওয়ার জন্য চড়া মূল্য দিতে হয়। মূল্য দিতে না পেরে অধিকাংশ সাধারণ পুরুষই বিবাহবিমুখ হয়ে যায়। নারীও বিবাহবিমুখ থাকে। জন্ম হার অস্বাভাবিক ভাবে হ্রাস পায়। তাই চীন সরকার উন্নত যৌন রোবট ও গর্ভধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন রোবট আবিস্কার করেছে এবং এগুলোর সাহায্যে সমস্যাগুলোর মোকাবিলা করার চেষ্টা করছে।